আইন অমান্য করে বরিশাল বিভাগে চলছে ইটভাটা

হাফিজুর রহমান খান, স্টাফ রিপোর্টারঃ
আইন লঙ্ঘন করে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ইটভাটা চালানো হচ্ছে। সরেজমিনে বরিশাল বিভাগের কয়েকটি ইটভাটায় ঘুরে দেখা যায় কৃষি জমি, বিভিন্ন নদীর পাড় থেকে মাটি কেটে এনে ব্যবহার করা হয় ইটভাটা। ইট ভাটার চিমনির উচ্চতা ১৩০ ফুট হওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ ইটভাটার চিমনির উচ্চতা কম আছে। ইট ভাটার ধুলাবালি এবং ধোয়ায় জনজীবন অতিষ্ট হয়ে পড়েছে। অসুস্থ হয়ে পড়েছে ছাত্র-ছাত্রী এবং বয়স্ক মানুষ। ইটভাটা থেকে ইট নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন ধরনের টাফি যা সরকার নিবন্ধিত নয়। টাফি চলাচল করার জন্য নষ্ট হচ্ছে রাস্তাঘাট।

বরিশাল বিভাগের অধিকাংশ ইটভাটায় খোলা বাথরুম স্থাপন করেছে। যার দুর্গন্ধে পাশ দিয়ে হাঁটাচলা করাই দুষ্কর। স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে স্থানীয় লোকজন।

পরিবেশ দপ্তর আইন অনুযায়ী লোকালয়,বাজার, বসতবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তত ০১(এক) কিলোমিটার দূরে ইটভাটা স্থাপনের নিয়ম থাকলেও কেউ তো মানছেন না। আইন অমান্য করে একের পর এক গড়ে উঠছে বেশিরভাগ ইটভাটা। ইটভাটার ধোয়া ও ধুলা বালির কারণে মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, বিপর্যয়ের মুখে কৃষি জমি। এতে বাতাস দূষিত হয়ে শ্বাসকষ্ট, চর্ম ও হাঁপানি সহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে স্থানীয়রা। বেশিরভাগ ঝুঁকিতে আছে নবজাতক শিশুরা। এরপরও কোন মাথা ব্যাথা নেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের।

পরিবেশ অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগের তথ্য মতে জানা গেছে, বরিশাল জেলায় ২২৫ টি,ঝালকাঠি জেলায় ৫২ টি, পিরোজপুর জেলায় ৪০ টি, ভোলা জেলায় ৯৬ টি, পটুয়াখালী জেলায় ৬৯ টি এবং বরগুনা জেলায় ৪৪ টি সর্বমোট ৫২৬ টি ইটভাটা আছে। বরিশাল বিভাগের সর্বমোট ২০৫ টি অবৈধ ইট ভাটা রয়েছে। এর মধ্যে অবৈধ ইট ভাটা বরিশাল ১১১টি,ভোলা ২৭ টি,পিরোজপুর ১৫ টি,ঝালকাঠি ৩০ এবং পটুয়াখালী ২২ টি সর্বমোট ২০৫ টি অবৈধ ইট ভাটা।

বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে অসংখ্য মানুষ জানিয়েছেন, ইট ভাটার ধুলাবালি এবং ধোয়ার কারণে এলাকার কৃষি ফসল হচ্ছেনা। আম বাগান নষ্ট হয়ে গেছে, নারিকেল গাছে নারিকেল ধরতেছে না এবং বিভিন্ন প্রকার ফলজ গাছে কল ধরতেছে না। বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ জানিয়েছেন এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ চাই। অধিকাংশ ইট ভাটার পাশেই আছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।ছোট ছোট শিশুরা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছে। এলাকার একাধিক মানুষ দাবি করেন সরকারের নিয়ম লংঘন করে যারা ইটভাটা চালায় তা যেন বন্ধ করে দেওয়া হয় এটাই সাধারণ মানুষের প্রশাসনের কাছে প্রত্যাশা।

বরগুনা জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ আবুল ফাত্তাহ বলেন, কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির চুল্লির ধোঁয়া অত্যন্ত বিষাক্ত। এতে থাকা কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই–অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, ফর্মালডিহাইড ও কালো কার্বন খুব দ্রুত শ্বাসতন্ত্রে ক্ষতি করে। দীর্ঘমেয়াদে অ্যাজমা, ব্রংকাইটিস, ফুসফুস প্রদাহ, উচ্চ রক্তচাপ ও ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। চোখের জ্বালা, মাথা ঘোরা ও মস্তিষ্কে অক্সিজেন কম পৌঁছানোর ঝুঁকি থাকে।
শিশু ও গর্ভবতী নারীদের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।
যত দ্রুত সম্ভব এসব চুল্লি বন্ধ করা জরুরি, জানান তিনি।

বরগুনা জেলা কৃষি কর্মকর্তা জনাব রবীন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়ায় আশেপাশের ফসলের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। ফলজ গাছে ফল ধরতেছে না।পরিবেশ এবং কৃষকরা আছে হুমকির মুখে। ইটভাটা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ায় গাছের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ব্যহত হয়,পরাগায়ন প্রক্রিয়ায় ব্যহত হয় যার ফলে ফুল ফল ফলনের উপরে ৪০-৬০% পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। ফল সঠিকভাবে পরাগায়ন না হওয়ার কারণে ফল ঝড়ে পড়ে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয় সহকারী পরিচালক মোঃ সোহেল মাহমুদ বলেন, বরিশাল বিভাগের ০৬ টি জেলায় ২০৫ টি অবৈধ ইটভাটা আছে। ইতি পূর্বেই আমরা অভিযান চলমান রেখেছি। সামনেও এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। আমাদের বিভাগীয় পরিচালক এ বিষয়ে স্বচ্ছর রয়েছেন। আমরা অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছি। সবগুলো অবৈধ ইট ভাটার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *