ঢাকা ০৮:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বহুমুখী প্রতিভায় অনন্য

  • Golam Faruk
  • প্রকাশিত: ০৯:৩৭:১৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ অগাস্ট ২০২১
  • 26

বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ শব্দ তিনটি একইসূত্রে গাঁথা। বঙ্গবন্ধু ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকেই স্বাধীনতার লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে ধাপে ধাপে জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেন। তার নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তানি শাসন ও শোষণ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। এ স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে প্রতিটি পদক্ষেপ ও কার্যক্রম বাস্তবায়নের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নেপথ্য শক্তি, সাহস ও বিচক্ষণ পরামর্শক হয়ে জড়িয়ে ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিব।

বঙ্গবন্ধু কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। তখন থেকেই বঙ্গমাতা তার রাজনীতির চলনবলন ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। প্রথম থেকেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের কঠিন সংকট ও জটিল পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন সমস্যায় বঙ্গমাতা সময়োপযোগী পরামর্শ দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করেছেন। দেশ বিভাগের আগে ১৯৪৬ সালে দাঙ্গার সময় বঙ্গমাতা নিজে অসুস্থ থাকাবস্থায়ও স্বামীকে দাঙ্গা উপদ্রুত এলাকায় কাজ করতে উৎসাহ দিয়েছেন। চিঠি লিখে দেশের কাজে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন এভাবে- ‘আপনি শুধু আমার স্বামী হওয়ার জন্য জন্ম নেননি, দেশের কাজ করার জন্য জন্ম নিয়েছেন। দেশের কাজই আপনার সবচেয়ে বড় কাজ। আপনি নিশ্চিন্ত মনে সেই কাজে যান। আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আল্লাহর ওপর আমার ভার ছেড়ে দিন।’ বয়সের হিসাবে বঙ্গমাতা তখনও কিশোরী। গ্রামের ১৬ বছর বয়সি একজন কিশোরীর কত আধুনিক চিন্তাচেতনা! দেশপ্রেমকে সবার উপরে স্থান দিয়ে তিনি নিজের ও পরিবারের সুখ ও শান্তিকে ত্যাগ করেছেন।

ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে বঙ্গবন্ধুকে জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ কারাগারের যাতনা সহ্য করতে হয়েছে। কারাবন্দি অবস্থায় অনশন ধর্মঘট করার কারণে মাঝে মাঝে বঙ্গবন্ধু অসুস্থ হয়ে পড়তেন। বঙ্গবন্ধুকে সব দুঃখ ও নির্যাতন বরণের শক্তি, সাহস, ধৈর্য ও প্রেরণা দিয়েছেন এই সংগ্রামী নারী।

“কোন কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারী, / প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে বিজয় লক্ষ্মী নারী”- জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার এ দুটি লাইন বঙ্গমাতার জন্য শতভাগ প্রযোজ্য। তিনি রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত না থেকেও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও লক্ষ্য পূরণে তার চিন্তাভাবনার সাথী হয়ে রাজনীতির মহানায়কের পাশে থেকেছেন অবিচল। বঙ্গবন্ধু কারাগারে থাকাকালীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও ছাত্রনেতাদের পরম নির্ভরতা ও আস্থার শেষ আশ্রয়স্থল ছিলেন বঙ্গমাতা। দলকে সংগঠিত করা, কর্মীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান, সঠিক সময়ে সঠিক ও কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণসহ প্রতিটি পদক্ষেপে দক্ষতা, দূরদর্শিতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। নিজ হাতে চা-নাশতা পরিবেশন এবং খাবারের ব্যবস্থা করতেন। সভায় আলোচিত প্রতিটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতেন। সেজন্য গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন প্রায়ই বাড়িতে হানা দিত ও জিজ্ঞাসাবাদ করত এবং গ্রেফতারের ভয় দেখাত। এহেন কঠিন সময়ের মধ্যেও সংসার পরিচালনা করা, সন্তানদের লেখাপড়া ঠিক রাখা এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখাসহ সব ধরনের দায়িত্ব পালন করতেন। দলের নেতাকর্মীদের আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি কারাবন্দি নেতাদের পরিবারের জন্য মাসের বাজার ও হাত খরচ পাঠাতেন। বঙ্গবন্ধু ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘জীবনে এ পর্যন্ত চব্বিশটি মামলার মোকাবিলা করেছি, আসলে মোকাবিলা করেছে আমার স্ত্রী রেণু। সে-ই কাগজপত্র দলিল-দস্তাবেজ নিয়ে ছুটেছে এক উকিল থেকে আরেক উকিলে। ফলে আমার নামে মামলা মানে রেণুর নামে মামলা! রেণু ছাড়া আর কে ছিল তখন আমাকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করার?’ (আমার রেণু, পৃষ্ঠা-১৮)। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে সাক্ষাৎ করে দেশের পরিস্থিতি ও রাজনীতির সব খবরাখবর তাকে জানাতেন। বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনাও নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে দিতেন। আন্দোলন-সংগ্রামে নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা রাখতেন। আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদ থেকে ছাত্রলীগের যে কোনো বিষয় ছিল তার নখদর্পণে।

বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে জনগণকে ছয় দফা আন্দোলনের পক্ষে উদ্বুদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন জেলায় জনসভায় ভাষণ দেন এবং বারবার গ্রেফতার ও কারাবন্দি হন। বঙ্গমাতা দৃঢ়চিত্তে ছয় দফার পক্ষে অবস্থান নেন এবং আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দির মুক্তির দাবিতে আন্দোলনের তীব্রতায় তৎকালীন সরকার নমনীয় হয়ে লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বঙ্গমাতার পরামর্শে বঙ্গবন্ধু প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। প্যারোলের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার বার্তাটি বঙ্গমাতা তার কন্যা হাসুকে দিয়ে কারাগারে বঙ্গবন্ধুর কাছে পাঠিয়েছিলেন। গণঅভ্যুত্থানের মুখে সরকার ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এ প্রসঙ্গে আমার একটি স্মৃতি মনে পড়ে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারাবন্দি বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে ১৯৬৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল থেকে নৌকা ও মাইক ভাড়া করে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া যাই। যাত্রাপথে আমরা ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’, ‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা’ স্লোগান দিতে দিতে যাই। স্লোগান শুনে নদীর দু’পাড়ের জনগণ ভিড় করে এবং আমাদের স্বাগত জানায়। তখন আমি গজারিয়া থানা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা মহিলা সম্পাদক ছিলাম। পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় ভবেরচর ঈদগাহ মাঠে আমরা সভা করি। সেখানে ব্যাপক জনসমাবেশ হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতি তাদের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তি না নেওয়ার বঙ্গমাতার সেই বিজ্ঞ সিদ্ধান্ত পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে।

১৯৭০-এর নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ‘ভোটের আগে ভাত চাই’ দাবি তুললে বঙ্গমাতা আওয়ামী লীগের নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নেন। নির্বাচন দিতে পাকিস্তান সরকারকে বাধ্য করা হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার ফলেই ১৯৭১ সালে ১০ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে শপথ গ্রহণ করে বিধায় মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বহির্বিশ্বে এ সরকার দেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায় করে।

বঙ্গবন্ধুর জীবনে তার প্রভাব ছিল অপরিসীম। রাজনৈতিক সংকটে রেখেছেন অসাধারণ বিচক্ষণতার পরিচয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের বক্তব্য কি হবে, তা নিয়ে নানাজন তাকে লিখিত-অলিখিতভাবে নানা পরামর্শ দিতে থাকেন। এক্ষেত্রে বঙ্গমাতার পরামর্শই বঙ্গবন্ধু গ্রহণ করেছিলেন- ‘সমগ্র দেশের মানুষ তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সবার ভাগ্য আজ তোমার ওপর নির্ভর করছে। …তোমার মনে যে কথা আসবে সে কথা বলবে। বাংলাদেশের মানুষকে নিয়ে তোমার যে স্বপ্ন সেই কথাগুলো তুমি স্পষ্ট করে বলে দিবে।’ বঙ্গবন্ধু নিজের কথাটিই বললেন, যা মুক্তির মঞ্চে উজ্জীবিত সমগ্র বাঙালিরও মনের কথা- ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’ বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণটি শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসাবে ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কোর বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য দলিলে স্বীকৃতি পেয়েছে।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দুই পুত্র শেখ কামাল ও শেখ জামাল ছিলেন রণক্ষেত্রে। তিন সন্তানসহ বঙ্গমাতা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে কারাবন্দি থেকেও পাকিস্তানে কারাবন্দি স্বামীর জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে গভীর অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা সত্ত্বেও সীমাহীন ধৈর্য, সাহস ও বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে তার চিরস্মরণীয় অবদান, দেশ ও জাতির জন্য তার অপরিসীম ত্যাগ, সাহসিকতা ও বিচক্ষণতার কারণে জাতি তাকে যথার্থই ‘বঙ্গমাতা’ উপাধিতে অভিষিক্ত করেছে। তিনি মানবসেবা ও কল্যাণে নিবেদিত ছিলেন।

ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা এমপি : প্রতিমন্ত্রী, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়; গবেষক ও রাজনীতিক

বিষয় :
প্রতিবেদক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য

Golam Faruk

জনপ্রিয়

বহুমুখী প্রতিভায় অনন্য

প্রকাশিত: ০৯:৩৭:১৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ অগাস্ট ২০২১

বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ শব্দ তিনটি একইসূত্রে গাঁথা। বঙ্গবন্ধু ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকেই স্বাধীনতার লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে ধাপে ধাপে জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেন। তার নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তানি শাসন ও শোষণ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। এ স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে প্রতিটি পদক্ষেপ ও কার্যক্রম বাস্তবায়নের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নেপথ্য শক্তি, সাহস ও বিচক্ষণ পরামর্শক হয়ে জড়িয়ে ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিব।

বঙ্গবন্ধু কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। তখন থেকেই বঙ্গমাতা তার রাজনীতির চলনবলন ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। প্রথম থেকেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের কঠিন সংকট ও জটিল পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন সমস্যায় বঙ্গমাতা সময়োপযোগী পরামর্শ দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করেছেন। দেশ বিভাগের আগে ১৯৪৬ সালে দাঙ্গার সময় বঙ্গমাতা নিজে অসুস্থ থাকাবস্থায়ও স্বামীকে দাঙ্গা উপদ্রুত এলাকায় কাজ করতে উৎসাহ দিয়েছেন। চিঠি লিখে দেশের কাজে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন এভাবে- ‘আপনি শুধু আমার স্বামী হওয়ার জন্য জন্ম নেননি, দেশের কাজ করার জন্য জন্ম নিয়েছেন। দেশের কাজই আপনার সবচেয়ে বড় কাজ। আপনি নিশ্চিন্ত মনে সেই কাজে যান। আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আল্লাহর ওপর আমার ভার ছেড়ে দিন।’ বয়সের হিসাবে বঙ্গমাতা তখনও কিশোরী। গ্রামের ১৬ বছর বয়সি একজন কিশোরীর কত আধুনিক চিন্তাচেতনা! দেশপ্রেমকে সবার উপরে স্থান দিয়ে তিনি নিজের ও পরিবারের সুখ ও শান্তিকে ত্যাগ করেছেন।

ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে বঙ্গবন্ধুকে জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ কারাগারের যাতনা সহ্য করতে হয়েছে। কারাবন্দি অবস্থায় অনশন ধর্মঘট করার কারণে মাঝে মাঝে বঙ্গবন্ধু অসুস্থ হয়ে পড়তেন। বঙ্গবন্ধুকে সব দুঃখ ও নির্যাতন বরণের শক্তি, সাহস, ধৈর্য ও প্রেরণা দিয়েছেন এই সংগ্রামী নারী।

“কোন কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারী, / প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে বিজয় লক্ষ্মী নারী”- জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার এ দুটি লাইন বঙ্গমাতার জন্য শতভাগ প্রযোজ্য। তিনি রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত না থেকেও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও লক্ষ্য পূরণে তার চিন্তাভাবনার সাথী হয়ে রাজনীতির মহানায়কের পাশে থেকেছেন অবিচল। বঙ্গবন্ধু কারাগারে থাকাকালীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও ছাত্রনেতাদের পরম নির্ভরতা ও আস্থার শেষ আশ্রয়স্থল ছিলেন বঙ্গমাতা। দলকে সংগঠিত করা, কর্মীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান, সঠিক সময়ে সঠিক ও কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণসহ প্রতিটি পদক্ষেপে দক্ষতা, দূরদর্শিতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। নিজ হাতে চা-নাশতা পরিবেশন এবং খাবারের ব্যবস্থা করতেন। সভায় আলোচিত প্রতিটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতেন। সেজন্য গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন প্রায়ই বাড়িতে হানা দিত ও জিজ্ঞাসাবাদ করত এবং গ্রেফতারের ভয় দেখাত। এহেন কঠিন সময়ের মধ্যেও সংসার পরিচালনা করা, সন্তানদের লেখাপড়া ঠিক রাখা এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখাসহ সব ধরনের দায়িত্ব পালন করতেন। দলের নেতাকর্মীদের আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি কারাবন্দি নেতাদের পরিবারের জন্য মাসের বাজার ও হাত খরচ পাঠাতেন। বঙ্গবন্ধু ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘জীবনে এ পর্যন্ত চব্বিশটি মামলার মোকাবিলা করেছি, আসলে মোকাবিলা করেছে আমার স্ত্রী রেণু। সে-ই কাগজপত্র দলিল-দস্তাবেজ নিয়ে ছুটেছে এক উকিল থেকে আরেক উকিলে। ফলে আমার নামে মামলা মানে রেণুর নামে মামলা! রেণু ছাড়া আর কে ছিল তখন আমাকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করার?’ (আমার রেণু, পৃষ্ঠা-১৮)। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে সাক্ষাৎ করে দেশের পরিস্থিতি ও রাজনীতির সব খবরাখবর তাকে জানাতেন। বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনাও নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে দিতেন। আন্দোলন-সংগ্রামে নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা রাখতেন। আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদ থেকে ছাত্রলীগের যে কোনো বিষয় ছিল তার নখদর্পণে।

বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে জনগণকে ছয় দফা আন্দোলনের পক্ষে উদ্বুদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন জেলায় জনসভায় ভাষণ দেন এবং বারবার গ্রেফতার ও কারাবন্দি হন। বঙ্গমাতা দৃঢ়চিত্তে ছয় দফার পক্ষে অবস্থান নেন এবং আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দির মুক্তির দাবিতে আন্দোলনের তীব্রতায় তৎকালীন সরকার নমনীয় হয়ে লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বঙ্গমাতার পরামর্শে বঙ্গবন্ধু প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। প্যারোলের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার বার্তাটি বঙ্গমাতা তার কন্যা হাসুকে দিয়ে কারাগারে বঙ্গবন্ধুর কাছে পাঠিয়েছিলেন। গণঅভ্যুত্থানের মুখে সরকার ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এ প্রসঙ্গে আমার একটি স্মৃতি মনে পড়ে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারাবন্দি বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে ১৯৬৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল থেকে নৌকা ও মাইক ভাড়া করে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া যাই। যাত্রাপথে আমরা ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’, ‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা’ স্লোগান দিতে দিতে যাই। স্লোগান শুনে নদীর দু’পাড়ের জনগণ ভিড় করে এবং আমাদের স্বাগত জানায়। তখন আমি গজারিয়া থানা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা মহিলা সম্পাদক ছিলাম। পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় ভবেরচর ঈদগাহ মাঠে আমরা সভা করি। সেখানে ব্যাপক জনসমাবেশ হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতি তাদের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তি না নেওয়ার বঙ্গমাতার সেই বিজ্ঞ সিদ্ধান্ত পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে।

১৯৭০-এর নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ‘ভোটের আগে ভাত চাই’ দাবি তুললে বঙ্গমাতা আওয়ামী লীগের নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নেন। নির্বাচন দিতে পাকিস্তান সরকারকে বাধ্য করা হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার ফলেই ১৯৭১ সালে ১০ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে শপথ গ্রহণ করে বিধায় মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বহির্বিশ্বে এ সরকার দেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায় করে।

বঙ্গবন্ধুর জীবনে তার প্রভাব ছিল অপরিসীম। রাজনৈতিক সংকটে রেখেছেন অসাধারণ বিচক্ষণতার পরিচয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের বক্তব্য কি হবে, তা নিয়ে নানাজন তাকে লিখিত-অলিখিতভাবে নানা পরামর্শ দিতে থাকেন। এক্ষেত্রে বঙ্গমাতার পরামর্শই বঙ্গবন্ধু গ্রহণ করেছিলেন- ‘সমগ্র দেশের মানুষ তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সবার ভাগ্য আজ তোমার ওপর নির্ভর করছে। …তোমার মনে যে কথা আসবে সে কথা বলবে। বাংলাদেশের মানুষকে নিয়ে তোমার যে স্বপ্ন সেই কথাগুলো তুমি স্পষ্ট করে বলে দিবে।’ বঙ্গবন্ধু নিজের কথাটিই বললেন, যা মুক্তির মঞ্চে উজ্জীবিত সমগ্র বাঙালিরও মনের কথা- ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’ বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণটি শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসাবে ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কোর বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য দলিলে স্বীকৃতি পেয়েছে।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দুই পুত্র শেখ কামাল ও শেখ জামাল ছিলেন রণক্ষেত্রে। তিন সন্তানসহ বঙ্গমাতা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে কারাবন্দি থেকেও পাকিস্তানে কারাবন্দি স্বামীর জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে গভীর অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা সত্ত্বেও সীমাহীন ধৈর্য, সাহস ও বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে তার চিরস্মরণীয় অবদান, দেশ ও জাতির জন্য তার অপরিসীম ত্যাগ, সাহসিকতা ও বিচক্ষণতার কারণে জাতি তাকে যথার্থই ‘বঙ্গমাতা’ উপাধিতে অভিষিক্ত করেছে। তিনি মানবসেবা ও কল্যাণে নিবেদিত ছিলেন।

ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা এমপি : প্রতিমন্ত্রী, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়; গবেষক ও রাজনীতিক