ঢাকা ১০:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বাবার গলায় গুলির দাগের আবছা স্মৃতি মনে পড়ে

  • Golam Faruk
  • প্রকাশিত: ০৯:৩৪:২১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২১
  • 31

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বজন হারানোদের একজন। পৌনে চার বছর বয়সে তিনি বাবা শেখ ফজলুল হক মনি ও মা আরজু মনিকে হারান। অবুঝ বয়সে নারকীয় হত্যাযজ্ঞে বাবা-মা হারানোয় তাদের সঙ্গে তেমন কোনো স্মৃতি মনে পড়ে না তার। এসব বিষয়ে  সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আপনি বাবা-মাকে হারিয়েছেন, সে সময়ের কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?

ব্যারিস্টার তাপস : আমার বয়স তখন মাত্র পৌনে চার বছর। সে হিসাবে আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে তেমন কোনো আনন্দ বা আবেগের স্মৃতি মনে পড়ে না। ওই দিনের ঘটনার কিছু আবছা স্মৃতি আমার বাবার লাশটা মনে পড়ে। বাবাকে যখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন মেঝের ওপর অনেক রক্ত জমা ছিল। সে স্মৃতিটা ভেসে ওঠে। আমার বাবার গলায় একটি গুলি লেগেছিল। তিনি সাদা হাতাকাটা গেঞ্জি পরা ছিলেন। আবছা আবছা চেহারা ভাসে। এটা যে আমার স্মৃতি সেটা দীর্ঘদিন উপলব্ধি করতে পারিনি, তবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর উপলব্ধি করতে পেরেছি হয়তো এটা আমার একমাত্র স্মৃতি। মায়ের সাথে আমার কোনো স্মৃতি মনে পড়ে না। তারপর সবকিছু শুনে জেনেছি। এটা উপলব্ধি, স্মৃতি তেমন কিছু নেই।

 ১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ কী ছিল?

ব্যারিস্টার তাপস : বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড মামলা হওয়ার মাধ্যমে অনেক তথ্য-উপাত্ত বেরিয়ে এসেছে। এ হত্যাকাণ্ডে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল সে তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তার পরও যারা নেপথ্যে ছিলেন, তাদের অনেকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তবে আমরা এতটুকু সান্ত্বনা পাই যে, এ হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে।

বিচার সম্পন্ন করা কতটা চ্যালেঞ্জের ছিল?

ব্যারিস্টার তাপস : আপনি জানেন যে, বিচার প্রক্রিয়াটা বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। পথ রুদ্ধ ছিল। সেটাও একটি বড় সংগ্রাম ছিল। একজন নাগরিক হিসাবে যদি পিতামাতা হত্যার বিচার না পাই, তাহলে সেটা আমার যে মৌলিক অধিকার সেটা থেকে বঞ্চিত হওয়া। এ বঞ্চিত অবস্থায় আমাদের দীর্ঘ জীবন পাড়ি দিতে হয়েছে। এটা একটি বড় কষ্ট ছিল। এক দিকে হত্যা যেমন অন্যায়, বিচার না হওয়াটাও একটা সামাজিক অন্যায়। সেই জায়গা থেকে আমরা খুবই কষ্টে ছিলাম। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। তার পরও ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করে রাখা হয়। রায় কার্যকর হওয়াতে কিছুটা শান্তি পাই।

 বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করে রাখার বিষয়টিকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ব্যারিস্টার তাপস : দেখুন গণতন্ত্রের কথা বলা হয়। গণতন্ত্রের মূল যে অবকাঠামো সেটাই হলো বিচার ব্যবস্থা, সুশাসিত বিচার ব্যবস্থা, স্বতন্ত্র বিচার ব্যবস্থা। অপরাধ করলে অপরাধের শাস্তি হবে-এটাই মূল কথা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কলঙ্কময় সময় গেছে, যে সময় আমরা এ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলাম। এ বিচার প্রক্রিয়া যারা বন্ধ রেখেছিল তাদেরও বিচার হওয়া উচিত। এক সময় ইতিহাসের কাঠগড়ায় তাদেরও দাঁড়াতে হবে।

১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য নায়কদের বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে আপনার চিন্তা কী?

ব্যারিস্টার তাপস : ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের খুনিদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। আমরা কলঙ্কের একটি ধাপ অতিক্রম করেছি। বিচার সম্পন্ন হওয়াতে আমরা কিছুটা কলঙ্কমুক্ত হয়েছি। তবে যত দিন নেপথ্য নায়কদের চিহ্নিত করে বিচার নিশ্চিত করা যাবে না, তত দিন আমরা পুরোপুরি কলঙ্কমুক্ত হব না। আমি বিশ্বাস করি ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যারা ছিলেন, তাদের ব্যাপারেও সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

বিষয় :
প্রতিবেদক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য

Golam Faruk

জনপ্রিয়

বাবার গলায় গুলির দাগের আবছা স্মৃতি মনে পড়ে

প্রকাশিত: ০৯:৩৪:২১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২১

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বজন হারানোদের একজন। পৌনে চার বছর বয়সে তিনি বাবা শেখ ফজলুল হক মনি ও মা আরজু মনিকে হারান। অবুঝ বয়সে নারকীয় হত্যাযজ্ঞে বাবা-মা হারানোয় তাদের সঙ্গে তেমন কোনো স্মৃতি মনে পড়ে না তার। এসব বিষয়ে  সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আপনি বাবা-মাকে হারিয়েছেন, সে সময়ের কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?

ব্যারিস্টার তাপস : আমার বয়স তখন মাত্র পৌনে চার বছর। সে হিসাবে আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে তেমন কোনো আনন্দ বা আবেগের স্মৃতি মনে পড়ে না। ওই দিনের ঘটনার কিছু আবছা স্মৃতি আমার বাবার লাশটা মনে পড়ে। বাবাকে যখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন মেঝের ওপর অনেক রক্ত জমা ছিল। সে স্মৃতিটা ভেসে ওঠে। আমার বাবার গলায় একটি গুলি লেগেছিল। তিনি সাদা হাতাকাটা গেঞ্জি পরা ছিলেন। আবছা আবছা চেহারা ভাসে। এটা যে আমার স্মৃতি সেটা দীর্ঘদিন উপলব্ধি করতে পারিনি, তবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর উপলব্ধি করতে পেরেছি হয়তো এটা আমার একমাত্র স্মৃতি। মায়ের সাথে আমার কোনো স্মৃতি মনে পড়ে না। তারপর সবকিছু শুনে জেনেছি। এটা উপলব্ধি, স্মৃতি তেমন কিছু নেই।

 ১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ কী ছিল?

ব্যারিস্টার তাপস : বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড মামলা হওয়ার মাধ্যমে অনেক তথ্য-উপাত্ত বেরিয়ে এসেছে। এ হত্যাকাণ্ডে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল সে তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তার পরও যারা নেপথ্যে ছিলেন, তাদের অনেকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তবে আমরা এতটুকু সান্ত্বনা পাই যে, এ হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে।

বিচার সম্পন্ন করা কতটা চ্যালেঞ্জের ছিল?

ব্যারিস্টার তাপস : আপনি জানেন যে, বিচার প্রক্রিয়াটা বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। পথ রুদ্ধ ছিল। সেটাও একটি বড় সংগ্রাম ছিল। একজন নাগরিক হিসাবে যদি পিতামাতা হত্যার বিচার না পাই, তাহলে সেটা আমার যে মৌলিক অধিকার সেটা থেকে বঞ্চিত হওয়া। এ বঞ্চিত অবস্থায় আমাদের দীর্ঘ জীবন পাড়ি দিতে হয়েছে। এটা একটি বড় কষ্ট ছিল। এক দিকে হত্যা যেমন অন্যায়, বিচার না হওয়াটাও একটা সামাজিক অন্যায়। সেই জায়গা থেকে আমরা খুবই কষ্টে ছিলাম। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। তার পরও ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করে রাখা হয়। রায় কার্যকর হওয়াতে কিছুটা শান্তি পাই।

 বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করে রাখার বিষয়টিকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ব্যারিস্টার তাপস : দেখুন গণতন্ত্রের কথা বলা হয়। গণতন্ত্রের মূল যে অবকাঠামো সেটাই হলো বিচার ব্যবস্থা, সুশাসিত বিচার ব্যবস্থা, স্বতন্ত্র বিচার ব্যবস্থা। অপরাধ করলে অপরাধের শাস্তি হবে-এটাই মূল কথা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কলঙ্কময় সময় গেছে, যে সময় আমরা এ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলাম। এ বিচার প্রক্রিয়া যারা বন্ধ রেখেছিল তাদেরও বিচার হওয়া উচিত। এক সময় ইতিহাসের কাঠগড়ায় তাদেরও দাঁড়াতে হবে।

১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য নায়কদের বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে আপনার চিন্তা কী?

ব্যারিস্টার তাপস : ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের খুনিদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। আমরা কলঙ্কের একটি ধাপ অতিক্রম করেছি। বিচার সম্পন্ন হওয়াতে আমরা কিছুটা কলঙ্কমুক্ত হয়েছি। তবে যত দিন নেপথ্য নায়কদের চিহ্নিত করে বিচার নিশ্চিত করা যাবে না, তত দিন আমরা পুরোপুরি কলঙ্কমুক্ত হব না। আমি বিশ্বাস করি ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যারা ছিলেন, তাদের ব্যাপারেও সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করবে।