ঢাকা ০৫:৫৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

কাগজে সই করলেই হবে না, খেলাপি ঋণ কমানো কঠিন

খেলাপি ঋণ কমাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তারা মনে করেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) যেসব সংস্কার প্রস্তাব করেছে, বাংলাদেশ সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবে না। কারণ, সংস্কার কাজে প্রভাবশালীরা বাধা দিয়ে থাকে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব হবে না, যদি না সরকার রাজনৈতিকভাবে কমাতে না চায়। গতকাল শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে সানেম আয়োজিত অর্থনীতিবিদ সম্মেলনে অর্থনীতিবিদরা এসব কথা বলেন।

দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের প্রথম দিনে সংকটময় পরিস্থিতিতে অর্থনীতি ও বাণিজ্যের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ এবং সমাধান নিয়ে আলোচনা করা হয়। এতে দেশ-বিদেশের অর্থনীতিবিদরা অংশ নেন। এটি সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) ষষ্ঠবারের আয়োজন। সম্মেলনে অর্থনীতিবিদরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তারা বলেন, যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, তাতে কর্মসংস্থান হচ্ছে না আবার বৈষম্যও কমছে না।

সম্মেলনে আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাব এবং এর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বা বৈশ্বিক কারণ দায়ী নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দুর্বলতাও এর পেছনে বড় একটা কারণ। তারা বলেন, অভ্যন্তরীণ সংস্কারের কথা দীর্ঘদিন ধরে বলা হলেও এটা করা হয়নি। কিন্তু সংস্কারগুলো প্রয়োজন। কিন্তু সংস্কারের প্রভাব যাতে শুধু সাধারণ জনগণের ওপর না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সংস্কার করতে গিয়ে বিভিন্ন জিনিসের দাম বাড়িয়ে দিয়ে যদি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, সেটা ঠিক হবে না। কারণ, সংস্কারের ফলে বিভিন্ন জিনিসের মূল্য বৃদ্ধি পাবে।

কালবেলা পত্রিকা অনলাইনের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সম্মেলনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে যে সংকট, সেটি শুধু বৈদেশিক কারণে হয়েছে, তা নয়। দেশের কাঠামোগত দুর্বলতা, দীর্ঘদিনের অবহেলা এবং সংস্কারে আগ্রহের অভাবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার ও জনগণ সংস্কারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখে না। আর সুবিধাভোগী পক্ষ সংস্কার আটকে রাখে। তিনি তার প্রবন্ধে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের সমস্যাগুলো তুলে ধরেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রবৃদ্ধির হার কমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতির চাপ, লেনদেনের ভারসাম্য, ঋণের বোঝা, দরিদ্রতা এবং শ্রমবাজার এগুলো মূলত দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে কাজ করছে। প্রতিবেদনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। এ প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় অবদান গার্মেন্ট সেক্টরের। তবে এখন এ সেক্টরে পণ্যেরে বহুমুখীকরণ করতে হবে। দেশে বিভিন্ন মেগা প্রকল্প হচ্ছে । তবে এগুলো বিলম্ব বাস্তবায়ন এবং খরচ বেশি হচ্ছে। দেশে শিশু এবং মাতৃত্বকালীন মৃত্যুহার কমলেও মানসম্মত শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য এখনো নিশ্চিত হয়নি। একই সঙ্গে শিক্ষায় উন্নত দেশের তুলনায় সরকারের ব্যয় অনেক কম। সেলিম রায়হানের প্রবন্ধের ওপর আলোচনায় অংশ নেনে দেশবরেণ্য অর্থনীতিবিদরা। এ সময় দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোগত দুর্বলতা সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তার কারণ নেই। অর্থনীতি এখন ভালোর দিকে যাচ্ছে। রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স বাড়ছে, রিজার্ভও বাড়ছে। অর্থনীতির সব ক্ষেত্রেই উন্নতি হচ্ছে। আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি বলেন, আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাব যৌক্তিক। সরকারও চায় সংস্কার করতে। এরই মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে সংস্কার করা হচ্ছে। তবে সংস্কার তো চাইলেই হয় না। এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তবে এরই মধ্যে কিছু কিছু সংস্কার আনা হয়েছে বলে আইএমএফ ঋণ দিয়েছে। আইএমএফের পরামর্শগুলো দেশের অর্থনীতিকে আরও সক্রিয় করতে সাহায্য করবে বলেও জানান তিনি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য শুধু ভালো ভালো নীতিমালা করলেই হবে না। এগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুশাসন। সরকার এখন দেশকে স্মার্ট করার পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু পরিকল্পনা। তিনি বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে সতর্কতার সঙ্গে অর্থায়ন করতে হবে। তিনি সরকারের বাজেটের সমালোচনা করে বলেন, দেশের স্থায়ী উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো। কিন্তু সরকার সেটা না করে অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। অবকাঠামোর পাশাপাশি সেবার মানও উন্নয়ন করতে হবে।

খেলাপি ঋণের বিষয়ে তিনি বলেন, যারা ঋণখেলাপি হচ্ছে, তারা শুধু ব্যাংকের ক্ষতি করছে, একই সঙ্গে দেশের ক্ষতি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে উদ্যোগী হতে হবে।

অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, আইএমএফের পক্ষ থেকে খেলাপি ঋণ কমানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এটা করা কঠিন। শুধু কাগজে সই করলেই খেলাপি ঋণ কমে যাবে না। কারণ, এটা পুরোপুরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। তিনি আরও বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ বড় কথা নয়। মূল বিষয় হচ্ছে রিজার্ভ কমার প্রবণতা। রিজার্ভের প্রবণতা নিচের দিকে নামতে থাকলে ঠেকানো কঠিন। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রিজার্ভ একসময় ৩০০ কোটি ডলারও ছিল। তাই পরিমাণ অনেক সময় বড় সমস্যা নয়, প্রবণতাটাই বড় কথা। তিনি বলেন, সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অথচ শিক্ষা খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ জিডিপির ২ শতাংশ।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, প্রভাবশালীরা সংস্কারকে বাধাগ্রস্ত করে। বহু বছর ধরে বাংলাদেশের কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। এগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু নীতিনির্ধারকরা এ ধরনের সমস্যা সমাধানের বিষয়ে কম আগ্রহ দেখান। নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ বাড়াতে চার বছর আগে বিশ্বব্যাংক এ বিষয়ে সংস্কারের প্রস্তাব করেছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ২০১৭ শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রবিষয়ক নীতিমালার অনুমোদনও করেছে। কিন্তু সরকার এ আইন বাস্তবায়ন ভুলে গেছে।

পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, এখন সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থীতিশীলতা খুবই প্রয়োজন। তবে এ সমস্যাগুলো একদিনেই হয়নি। এগুলো দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা। আমাদের দেশজ মোট উৎপাদনের তুলনায় ট্যাক্স আহরণ কম। সঠিক মুদ্রানীতি নেই। বিনিময় হার অস্থিতিশীল। তিনি বলেন, সরকার সময়মতো আইএমএফের কাছে ঋণ চেয়েছে এবং তা পেয়েও গেছে। তবে বাকি কিস্তিগুলো পেতে আইএমএফের শর্তগুলোর বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন বলেন, অনেকদিন ধরেই বলা হচ্ছিল দুই মাসে ডলার সংকট কমে যাবে। কিন্তু সেই সময় আর আসছে না। আইএমএফের লোন এলে সংকট হয়তো কিছুটা কমবে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বাড়াতে হবে। নিজেরা শক্তিশালী থাকলে বাইরের অভিঘাত মোকাবিলা করা সম্ভব। এজন্য নিজেদের সম্পদ এবং অবকাঠামো শক্তিশালী করতে হবে।

বিষয় :
প্রতিবেদক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য

অনলাইন ডেস্ক

জনপ্রিয়

কাগজে সই করলেই হবে না, খেলাপি ঋণ কমানো কঠিন

প্রকাশিত: ০৪:৪৭:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৩

খেলাপি ঋণ কমাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তারা মনে করেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) যেসব সংস্কার প্রস্তাব করেছে, বাংলাদেশ সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবে না। কারণ, সংস্কার কাজে প্রভাবশালীরা বাধা দিয়ে থাকে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব হবে না, যদি না সরকার রাজনৈতিকভাবে কমাতে না চায়। গতকাল শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে সানেম আয়োজিত অর্থনীতিবিদ সম্মেলনে অর্থনীতিবিদরা এসব কথা বলেন।

দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের প্রথম দিনে সংকটময় পরিস্থিতিতে অর্থনীতি ও বাণিজ্যের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ এবং সমাধান নিয়ে আলোচনা করা হয়। এতে দেশ-বিদেশের অর্থনীতিবিদরা অংশ নেন। এটি সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) ষষ্ঠবারের আয়োজন। সম্মেলনে অর্থনীতিবিদরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তারা বলেন, যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, তাতে কর্মসংস্থান হচ্ছে না আবার বৈষম্যও কমছে না।

সম্মেলনে আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাব এবং এর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বা বৈশ্বিক কারণ দায়ী নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দুর্বলতাও এর পেছনে বড় একটা কারণ। তারা বলেন, অভ্যন্তরীণ সংস্কারের কথা দীর্ঘদিন ধরে বলা হলেও এটা করা হয়নি। কিন্তু সংস্কারগুলো প্রয়োজন। কিন্তু সংস্কারের প্রভাব যাতে শুধু সাধারণ জনগণের ওপর না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সংস্কার করতে গিয়ে বিভিন্ন জিনিসের দাম বাড়িয়ে দিয়ে যদি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, সেটা ঠিক হবে না। কারণ, সংস্কারের ফলে বিভিন্ন জিনিসের মূল্য বৃদ্ধি পাবে।

কালবেলা পত্রিকা অনলাইনের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সম্মেলনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে যে সংকট, সেটি শুধু বৈদেশিক কারণে হয়েছে, তা নয়। দেশের কাঠামোগত দুর্বলতা, দীর্ঘদিনের অবহেলা এবং সংস্কারে আগ্রহের অভাবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার ও জনগণ সংস্কারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখে না। আর সুবিধাভোগী পক্ষ সংস্কার আটকে রাখে। তিনি তার প্রবন্ধে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের সমস্যাগুলো তুলে ধরেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রবৃদ্ধির হার কমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতির চাপ, লেনদেনের ভারসাম্য, ঋণের বোঝা, দরিদ্রতা এবং শ্রমবাজার এগুলো মূলত দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে কাজ করছে। প্রতিবেদনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। এ প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় অবদান গার্মেন্ট সেক্টরের। তবে এখন এ সেক্টরে পণ্যেরে বহুমুখীকরণ করতে হবে। দেশে বিভিন্ন মেগা প্রকল্প হচ্ছে । তবে এগুলো বিলম্ব বাস্তবায়ন এবং খরচ বেশি হচ্ছে। দেশে শিশু এবং মাতৃত্বকালীন মৃত্যুহার কমলেও মানসম্মত শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য এখনো নিশ্চিত হয়নি। একই সঙ্গে শিক্ষায় উন্নত দেশের তুলনায় সরকারের ব্যয় অনেক কম। সেলিম রায়হানের প্রবন্ধের ওপর আলোচনায় অংশ নেনে দেশবরেণ্য অর্থনীতিবিদরা। এ সময় দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোগত দুর্বলতা সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তার কারণ নেই। অর্থনীতি এখন ভালোর দিকে যাচ্ছে। রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স বাড়ছে, রিজার্ভও বাড়ছে। অর্থনীতির সব ক্ষেত্রেই উন্নতি হচ্ছে। আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি বলেন, আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাব যৌক্তিক। সরকারও চায় সংস্কার করতে। এরই মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে সংস্কার করা হচ্ছে। তবে সংস্কার তো চাইলেই হয় না। এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তবে এরই মধ্যে কিছু কিছু সংস্কার আনা হয়েছে বলে আইএমএফ ঋণ দিয়েছে। আইএমএফের পরামর্শগুলো দেশের অর্থনীতিকে আরও সক্রিয় করতে সাহায্য করবে বলেও জানান তিনি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য শুধু ভালো ভালো নীতিমালা করলেই হবে না। এগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুশাসন। সরকার এখন দেশকে স্মার্ট করার পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু পরিকল্পনা। তিনি বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে সতর্কতার সঙ্গে অর্থায়ন করতে হবে। তিনি সরকারের বাজেটের সমালোচনা করে বলেন, দেশের স্থায়ী উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো। কিন্তু সরকার সেটা না করে অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। অবকাঠামোর পাশাপাশি সেবার মানও উন্নয়ন করতে হবে।

খেলাপি ঋণের বিষয়ে তিনি বলেন, যারা ঋণখেলাপি হচ্ছে, তারা শুধু ব্যাংকের ক্ষতি করছে, একই সঙ্গে দেশের ক্ষতি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে উদ্যোগী হতে হবে।

অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, আইএমএফের পক্ষ থেকে খেলাপি ঋণ কমানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এটা করা কঠিন। শুধু কাগজে সই করলেই খেলাপি ঋণ কমে যাবে না। কারণ, এটা পুরোপুরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। তিনি আরও বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ বড় কথা নয়। মূল বিষয় হচ্ছে রিজার্ভ কমার প্রবণতা। রিজার্ভের প্রবণতা নিচের দিকে নামতে থাকলে ঠেকানো কঠিন। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রিজার্ভ একসময় ৩০০ কোটি ডলারও ছিল। তাই পরিমাণ অনেক সময় বড় সমস্যা নয়, প্রবণতাটাই বড় কথা। তিনি বলেন, সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অথচ শিক্ষা খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ জিডিপির ২ শতাংশ।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, প্রভাবশালীরা সংস্কারকে বাধাগ্রস্ত করে। বহু বছর ধরে বাংলাদেশের কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। এগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু নীতিনির্ধারকরা এ ধরনের সমস্যা সমাধানের বিষয়ে কম আগ্রহ দেখান। নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ বাড়াতে চার বছর আগে বিশ্বব্যাংক এ বিষয়ে সংস্কারের প্রস্তাব করেছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ২০১৭ শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রবিষয়ক নীতিমালার অনুমোদনও করেছে। কিন্তু সরকার এ আইন বাস্তবায়ন ভুলে গেছে।

পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, এখন সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থীতিশীলতা খুবই প্রয়োজন। তবে এ সমস্যাগুলো একদিনেই হয়নি। এগুলো দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা। আমাদের দেশজ মোট উৎপাদনের তুলনায় ট্যাক্স আহরণ কম। সঠিক মুদ্রানীতি নেই। বিনিময় হার অস্থিতিশীল। তিনি বলেন, সরকার সময়মতো আইএমএফের কাছে ঋণ চেয়েছে এবং তা পেয়েও গেছে। তবে বাকি কিস্তিগুলো পেতে আইএমএফের শর্তগুলোর বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন বলেন, অনেকদিন ধরেই বলা হচ্ছিল দুই মাসে ডলার সংকট কমে যাবে। কিন্তু সেই সময় আর আসছে না। আইএমএফের লোন এলে সংকট হয়তো কিছুটা কমবে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বাড়াতে হবে। নিজেরা শক্তিশালী থাকলে বাইরের অভিঘাত মোকাবিলা করা সম্ভব। এজন্য নিজেদের সম্পদ এবং অবকাঠামো শক্তিশালী করতে হবে।