ঢাকা ০৫:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

সন্ত্রাস ও ঋণের ফাঁদে পাকিস্তান

  • অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিত: ০৯:০২:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৩
  • 190

২০২০ সালে তুরস্কের এক কলেজে ভর্তি হওয়ার আগে পাকিস্তানের নাগরিক আজলান আলি রাওয়ালপিন্ডির এক বাজারে যেতেন নিয়মিত। রাজধানী ইসলামাবাদের কাছাকাছি ওই বাজারে ভালোভাবে ভাজা রুটি, ছোলা আর আলুর তরকারি পাওয়া যেত। এগুলো কেনার জন্য লম্বা সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হতো লাইনে। বাজারটি বিখ্যাত ছিল ঘিয়ে ভাজা মিঠাই ও ভালো মিষ্টির জন্য। দেশে ফিরে মাসখানেক আগে আবারও বাবার সঙ্গে ওই বাজারে গিয়েছিলেন আজলান। তবে পুরোনো চিত্রের দেখা মেলেনি। এমনকি ছিল না সেই পুরোনো ভিড়। ছিল না মিষ্টি কিংবা ঘিয়ে ভাজা মিঠাই। অল্পসংখ্যক ক্রেতা সেখানে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তুরস্কের সাবানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘এটাই সেই স্থান যেখানে আমি বেড়ে উঠেছি। এখন সবকিছু ফাঁকা হয়ে গেছে। মরে গেছে সব। আমি বিধ্বস্ত ও বিপন্ন বোধ করছি বাজারের চিত্র দেখে।’

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট বলছে, পাকিস্তান জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গ্যাস এবং বিদ্যুতের পাশাপাশি মিঠাই তৈরিতে ব্যবহৃত ঘি, রান্নার তেল, দুধ, চিনি আর ডিমের মতো খাদ্যদ্রব্যের দাম তিন বছরে কার্যত দ্বিগুণ হয়েছে। রিজার্ভ হ্রাস ও রুপির অবমূল্যায়নে এ বছর জানুয়ারিতে মুদ্রাস্ফীতি ৪৮ বছরের সর্বোচ্চ ২৭.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। পাকিস্তানের এই অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে সেখানকার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সাম্প্রতিক বন্যা, সামরিক-বেসামরিক এলিটদের দুর্নীতি ও অন্যায্য সুবিধা দেওয়া আর জবাবদিহিতাহীন অলাভজনক চীনা ঋণ গ্রহণকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে কথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে জড়িয়ে ব্যাপক সামরিক ব্যয়কেও দায়ী মনে করছেন কেউ কেউ।

গত বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ কমতে কমতে ৩০০ কোটি ডলারে নেমে গেছে। এদিন দেশটির মুদ্রা রুপির মানও ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছানোর আরেকটি রেকর্ড গড়েছে। পাকিস্তানের স্টেট ব্যাংকের (এসবিপি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের পর জানুয়ারির ২৭ তারিখে শেষ হওয়া সপ্তাহে তাদের রিজার্ভের পরিমাণ ১৬ শতাংশ কমে ৩০৯ কোটি ডলারে নেমে গেছে। এই অর্থ দিয়ে দেশটি তিন সপ্তাহের আমদানি ব্যয়ও মেটাতে পারবে না। স্থানীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আরিফ হাবিব লিমিটেডের (এএইচএল) তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের রিজার্ভ ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারির পর এখনই সবচেয়ে কম; এই অর্থ দিয়ে ১৮ দিনের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে, এত কম দিনের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো রিজার্ভ ১৯৯৮ সালের পর আর কখনোই দেখা যায়নি। এদিকে জ্বালানিসহ নিত্যপণ্যের অব্যাহত দাম বৃদ্ধিতে নাভিশ্বাস উঠছে মানুষের। সব মিলিয়ে জীবনযাত্রা সেখানে দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে।

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা : পাকিস্তানের অর্থনীতির অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হলেও সংকট মোকাবিলায় মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে ওই ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের রাজনীতিবিদরা ক্ষমতা নিয়েই টানাপড়েনে রয়েছে। গত বছরের এপ্রিলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে পাকিস্তান গভীর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। ইমরান পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা থেকে অপসারিত হয়েছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে পাকিস্তানে ‘শাসন পরিবর্তন’ করেছে। তিনি দেশটির বর্তমান সরকার এবং শক্তিশালী সামরিক জেনারেলদের সঙ্গে সংঘর্ষের পথ নিয়েছেন। ইমরান আগাম নির্বাচনের দাবি করছেন, তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন যে পাকিস্তানকে আগে তার অর্থনীতি ঠিক করতে হবে। অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জিয়া রেহমান ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি একটি বড় বিশৃঙ্খলায় পড়েছে এবং আমাদের অর্থের অভাব রয়েছে। সাধারণ নির্বাচন করা একটি ব্যয়বহুল বিষয় এবং আমি মনে করি পাকিস্তান এখনই এটি বহন করতে সক্ষম না।’

একজন দোকানদার ডয়চে ভেলেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন তোলেন, পাকিস্তানের কী সত্যিই ভবিষ্যৎ রয়েছে? ‘আমি জানি না, দেশে আসলে কী ঘটছে। আমরা ভালোবাসে একবেলা খাবার জোটাতেও পারছি না, অথচ আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের এদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।’ বলেছেন তিনি।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকার আবাসিক সাবেক মূখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ইমরান খান ব্যাপক জনপ্রিয়তার মধ্যে ক্ষমতায় এলো। অথচ বিভিন্ন ইস্যুতে তাকে বিদায় নিতে হলো। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, তাদের অর্থনেতিক দুরবস্থার জন্য অন্যতম কারণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা।
দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক আলতাফ পারভেজ সময়ের আলোকে বলেন, পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটটা বহুমুখী। সরকারের সঙ্গে বিরোধীদলের দ্বন্দ্ব, আবার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব, আবার মূল ধারার রাজনীতিবিদদের সঙ্গে তালেবানদের দ্বন্দ্ব। এই ত্রিমুখী দ্বন্দ্ব থেকে সহজে পাকিস্তান মুক্তি পাবে বলে মনে হয় না।

২০২২ সালের বন্যা : বৈশি^ক উষ্ণতার ফলস্বরূপ ২০২২ সালে ভয়াবহ বন্যা মোকাবিলা করতে হয়েছে পাকিস্তানকে, অর্থনীতিতে যার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ মারা গেছে এবং প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বানের পানির তোড়ে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, রেলপথ, ফসল, গবাদি পশু ভেসে গেছে।

পাকিস্তানের অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ কৃষিভিত্তিক। দেশটির কর্মকর্তারা সে সময় বলেছিলেন, নজিরবিহীন বন্যার পর পুনর্বাসনের জন্য ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। দেশজুড়ে গ্রামীণ পরিবারের আয়ের একটি মূল উৎস ৮০ লাখ গবাদি পশু বন্যায় ভেসে গেছে। যেসব কৃষকের ফসল ও গবাদিপশু ভেসে যায়নি, তারা তাদের গবাদি পশুর জন্য খাদ্য জোটাতে হিমশিম খেযেছেন। পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী শেরি রেহমানের তথ্য অনুযায়ী, চাল এবং ভুট্টাসহ প্রায় ৭০ শতাংশ পেঁয়াজের ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বন্যা তাদের ৫০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে। সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে।

সামরিক-বেসামরিক এলিটদের দুর্নীতি ও অন্যায্য সুবিধা : জাতিসংঘের এক নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী, করপোরেট সেক্টর, সামন্ত ভূস্বামী, রাজনৈতিক শ্রেণি আর দেশের সামরিক বাহিনীসহ পাকিস্তানের অভিজাত গোষ্ঠীগুলোকে দেওয়া অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধাগুলো আনুমানিক ১৭.৪ বিলিয়ন ডলার, যা সেখানকার সামগ্রিক অর্থনীতির ৬ শতাংশ। অর্থনৈতিক দুর্দশার এটাও একটা বড় কারণ।

করাচির মতো অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ অঞ্চলেও গ্যাস স্টেশনের বাইরে সারি সারি গাড়ির দীর্ঘ লাইন এখন পাকিস্তানের নিয়মিত চিত্র। জ্বালানি তেলের সংকট ভয়াবহ আকার নিয়েছে। যতটুকু যা পাওয়া যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তার খরচ জোটানো সম্ভব নয়। সংকট কেবল গ্যাসে নয়, এই সংকট গিয়ে পৌঁছেছে রান্নাঘরেও। গ্যাসের অভাবে রান্না করতে পারছে না মানুষ। বন্ধ করে দিতে হচ্ছে ছোট ছোট কারখানা। আর বিদ্যুতের সংকট তো রয়েছেই। ‘বিদ্যুতের সংকটে আমরা পঙ্গু হয়ে গেছি। আমাদের দৈনন্দিন কাজও চালাতে পারছি না। মনে হচ্ছে যেন আমরা প্রস্তর যুগে রয়েছি।’ ডনকে বলেছেন করাচির একজন গৃহবধূ মিসেস ওয়াসিম।

গবেষক আলতাফ পারভেজ সময়ের আলোকে বলেন, পাকিস্তানের নাজুক অর্থনীতির নেপথ্যে প্রথম কারণ হলো দুর্নীতি। পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা খুব দুর্নীতিগ্রস্ত। আর তাদের অর্থনীতির মূল অংশ চলে যায় সামরিক বাজেটে। এভাবেই দশকের পর দশক চলছে। বর্তমান অর্থনীতি এ ধারাটা আর নিতে পারছে না।
জবাবদিহিতাহীন অলাভজনক চীনা ঋণ : পাকিস্তানের অন্যতম বন্ধুরাষ্ট্র চীন। আইএমএফ জানাচ্ছে, পাকিস্তানের মোট বৈদেশিক ঋণের ৩০ শতাংশই চীন থেকে নেওয়া। দিল্লিভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজের গবেষক কমল মাদিশেঠী সিএনবিসিকে বলেছেন, এই চীনা ঋণগুলোর সঙ্গে অস্বচ্ছ শর্ত জড়িয়ে রয়েছে। প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা উপেক্ষা করা, পরিবেশগত এবং সামাজিক খরচ উপেক্ষা করা এবং সুদের উচ্চ হারের কারণে ঋণগুলো অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করেছে।

সিএনবিসি বলছে, ঋণের এই ফাঁদ আর বর্তমান আর্থিক অবস্থা সত্ত্বেও পাকিস্তান চীনের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ অব্যাহত রেখেছে। ‘সম্প্রতি ইসলামাবাদ একটি বড় রেল প্রকল্পের জন্য চীনের কাছ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ চেয়েছে। এই ধরনের সিদ্ধান্তগুলো অবশ্যই দেশটিকে তার ঋণের খেলাপি হওয়ার দিকে ঠেলে দেবে।’ বলেছেন মাদিশেঠী।

সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের ব্যয় : ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে তাদের ৭০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। পাকিস্তান যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ২০ বিলিয়ন ডলারের অর্থ সহায়তা পেয়েছে, সেখানে এই যুদ্ধে তাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ১৫০ বিলিয়ন ডলার। বিপুল পরিমাণের এই ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে; বলা হয়েছে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের বিশ্লেষণে।

ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, প্রতিরক্ষা খাতে পাকিস্তান লাগামহীন ব্যয় করছে। বিপুল অস্ত্র কিনতে হয়েছে। আর সেই অস্ত্র কিনতে তারা সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে।

লন্ডন ও দুবাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এশিয়ান লাইটের এক প্রতিবেদনে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নকেও অর্থনৈতিক সংকটের কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তেহরিক-ই তালেবানের মতো সংগঠনগুলোকে আর্থিক প্রণোদনা দিয়েছে সে দেশের সেনা স্টাবলিশমেন্ট।

আইএমএফের ঋণে সংকট কাটবে কী : পাকিস্তানের অর্থনীতি নিয়ে নবম পর্যালোচনার পর, অর্থাৎ ৯টি আলোচনার পর দেশটিকে ১.১ বিলিয়ন ডলার দিতে সম্মত হয়েছে আইএমএফ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি পাকিস্তানের জন্য অন্যান্য দেশ ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও দ্বিপক্ষীয় ঋণের পথকে প্রশস্ত করবে।

আইএমএফ চাচ্ছে, পাকিস্তান সরকার যেন দেশের রাজস্ব বাড়াতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এ প্রসঙ্গে ড. জাহিদ সময়ের আলোকে বলেন, ঋণ পেতে হলে তো একটা সমঝোতা হতে হবে। সমঝোতা না হলে ঋণ পাবে কী করে? আর আইএমএফ যখন ঋণ দেয় তখন সেই দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়। আর আলতাফ পারভেজ বলছেন, পাকিস্তানকে আইএমএফ ঋণ দিলেও তার একটি বড় অংশ সামরিক খাতেই চলে যাবে। এতে অর্থনৈতিক সংকটের কার্যকর কোনো সমাধান হবে না।

বিষয় :
প্রতিবেদক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য

অনলাইন ডেস্ক

জনপ্রিয়

সন্ত্রাস ও ঋণের ফাঁদে পাকিস্তান

প্রকাশিত: ০৯:০২:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৩

২০২০ সালে তুরস্কের এক কলেজে ভর্তি হওয়ার আগে পাকিস্তানের নাগরিক আজলান আলি রাওয়ালপিন্ডির এক বাজারে যেতেন নিয়মিত। রাজধানী ইসলামাবাদের কাছাকাছি ওই বাজারে ভালোভাবে ভাজা রুটি, ছোলা আর আলুর তরকারি পাওয়া যেত। এগুলো কেনার জন্য লম্বা সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হতো লাইনে। বাজারটি বিখ্যাত ছিল ঘিয়ে ভাজা মিঠাই ও ভালো মিষ্টির জন্য। দেশে ফিরে মাসখানেক আগে আবারও বাবার সঙ্গে ওই বাজারে গিয়েছিলেন আজলান। তবে পুরোনো চিত্রের দেখা মেলেনি। এমনকি ছিল না সেই পুরোনো ভিড়। ছিল না মিষ্টি কিংবা ঘিয়ে ভাজা মিঠাই। অল্পসংখ্যক ক্রেতা সেখানে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তুরস্কের সাবানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘এটাই সেই স্থান যেখানে আমি বেড়ে উঠেছি। এখন সবকিছু ফাঁকা হয়ে গেছে। মরে গেছে সব। আমি বিধ্বস্ত ও বিপন্ন বোধ করছি বাজারের চিত্র দেখে।’

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট বলছে, পাকিস্তান জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গ্যাস এবং বিদ্যুতের পাশাপাশি মিঠাই তৈরিতে ব্যবহৃত ঘি, রান্নার তেল, দুধ, চিনি আর ডিমের মতো খাদ্যদ্রব্যের দাম তিন বছরে কার্যত দ্বিগুণ হয়েছে। রিজার্ভ হ্রাস ও রুপির অবমূল্যায়নে এ বছর জানুয়ারিতে মুদ্রাস্ফীতি ৪৮ বছরের সর্বোচ্চ ২৭.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। পাকিস্তানের এই অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে সেখানকার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সাম্প্রতিক বন্যা, সামরিক-বেসামরিক এলিটদের দুর্নীতি ও অন্যায্য সুবিধা দেওয়া আর জবাবদিহিতাহীন অলাভজনক চীনা ঋণ গ্রহণকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে কথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে জড়িয়ে ব্যাপক সামরিক ব্যয়কেও দায়ী মনে করছেন কেউ কেউ।

গত বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ কমতে কমতে ৩০০ কোটি ডলারে নেমে গেছে। এদিন দেশটির মুদ্রা রুপির মানও ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছানোর আরেকটি রেকর্ড গড়েছে। পাকিস্তানের স্টেট ব্যাংকের (এসবিপি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের পর জানুয়ারির ২৭ তারিখে শেষ হওয়া সপ্তাহে তাদের রিজার্ভের পরিমাণ ১৬ শতাংশ কমে ৩০৯ কোটি ডলারে নেমে গেছে। এই অর্থ দিয়ে দেশটি তিন সপ্তাহের আমদানি ব্যয়ও মেটাতে পারবে না। স্থানীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আরিফ হাবিব লিমিটেডের (এএইচএল) তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের রিজার্ভ ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারির পর এখনই সবচেয়ে কম; এই অর্থ দিয়ে ১৮ দিনের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে, এত কম দিনের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো রিজার্ভ ১৯৯৮ সালের পর আর কখনোই দেখা যায়নি। এদিকে জ্বালানিসহ নিত্যপণ্যের অব্যাহত দাম বৃদ্ধিতে নাভিশ্বাস উঠছে মানুষের। সব মিলিয়ে জীবনযাত্রা সেখানে দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে।

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা : পাকিস্তানের অর্থনীতির অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হলেও সংকট মোকাবিলায় মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে ওই ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের রাজনীতিবিদরা ক্ষমতা নিয়েই টানাপড়েনে রয়েছে। গত বছরের এপ্রিলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে পাকিস্তান গভীর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। ইমরান পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা থেকে অপসারিত হয়েছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে পাকিস্তানে ‘শাসন পরিবর্তন’ করেছে। তিনি দেশটির বর্তমান সরকার এবং শক্তিশালী সামরিক জেনারেলদের সঙ্গে সংঘর্ষের পথ নিয়েছেন। ইমরান আগাম নির্বাচনের দাবি করছেন, তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন যে পাকিস্তানকে আগে তার অর্থনীতি ঠিক করতে হবে। অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জিয়া রেহমান ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি একটি বড় বিশৃঙ্খলায় পড়েছে এবং আমাদের অর্থের অভাব রয়েছে। সাধারণ নির্বাচন করা একটি ব্যয়বহুল বিষয় এবং আমি মনে করি পাকিস্তান এখনই এটি বহন করতে সক্ষম না।’

একজন দোকানদার ডয়চে ভেলেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন তোলেন, পাকিস্তানের কী সত্যিই ভবিষ্যৎ রয়েছে? ‘আমি জানি না, দেশে আসলে কী ঘটছে। আমরা ভালোবাসে একবেলা খাবার জোটাতেও পারছি না, অথচ আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের এদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।’ বলেছেন তিনি।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকার আবাসিক সাবেক মূখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ইমরান খান ব্যাপক জনপ্রিয়তার মধ্যে ক্ষমতায় এলো। অথচ বিভিন্ন ইস্যুতে তাকে বিদায় নিতে হলো। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, তাদের অর্থনেতিক দুরবস্থার জন্য অন্যতম কারণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা।
দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক আলতাফ পারভেজ সময়ের আলোকে বলেন, পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটটা বহুমুখী। সরকারের সঙ্গে বিরোধীদলের দ্বন্দ্ব, আবার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব, আবার মূল ধারার রাজনীতিবিদদের সঙ্গে তালেবানদের দ্বন্দ্ব। এই ত্রিমুখী দ্বন্দ্ব থেকে সহজে পাকিস্তান মুক্তি পাবে বলে মনে হয় না।

২০২২ সালের বন্যা : বৈশি^ক উষ্ণতার ফলস্বরূপ ২০২২ সালে ভয়াবহ বন্যা মোকাবিলা করতে হয়েছে পাকিস্তানকে, অর্থনীতিতে যার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ মারা গেছে এবং প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বানের পানির তোড়ে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, রেলপথ, ফসল, গবাদি পশু ভেসে গেছে।

পাকিস্তানের অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ কৃষিভিত্তিক। দেশটির কর্মকর্তারা সে সময় বলেছিলেন, নজিরবিহীন বন্যার পর পুনর্বাসনের জন্য ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। দেশজুড়ে গ্রামীণ পরিবারের আয়ের একটি মূল উৎস ৮০ লাখ গবাদি পশু বন্যায় ভেসে গেছে। যেসব কৃষকের ফসল ও গবাদিপশু ভেসে যায়নি, তারা তাদের গবাদি পশুর জন্য খাদ্য জোটাতে হিমশিম খেযেছেন। পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী শেরি রেহমানের তথ্য অনুযায়ী, চাল এবং ভুট্টাসহ প্রায় ৭০ শতাংশ পেঁয়াজের ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বন্যা তাদের ৫০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে। সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে।

সামরিক-বেসামরিক এলিটদের দুর্নীতি ও অন্যায্য সুবিধা : জাতিসংঘের এক নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী, করপোরেট সেক্টর, সামন্ত ভূস্বামী, রাজনৈতিক শ্রেণি আর দেশের সামরিক বাহিনীসহ পাকিস্তানের অভিজাত গোষ্ঠীগুলোকে দেওয়া অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধাগুলো আনুমানিক ১৭.৪ বিলিয়ন ডলার, যা সেখানকার সামগ্রিক অর্থনীতির ৬ শতাংশ। অর্থনৈতিক দুর্দশার এটাও একটা বড় কারণ।

করাচির মতো অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ অঞ্চলেও গ্যাস স্টেশনের বাইরে সারি সারি গাড়ির দীর্ঘ লাইন এখন পাকিস্তানের নিয়মিত চিত্র। জ্বালানি তেলের সংকট ভয়াবহ আকার নিয়েছে। যতটুকু যা পাওয়া যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তার খরচ জোটানো সম্ভব নয়। সংকট কেবল গ্যাসে নয়, এই সংকট গিয়ে পৌঁছেছে রান্নাঘরেও। গ্যাসের অভাবে রান্না করতে পারছে না মানুষ। বন্ধ করে দিতে হচ্ছে ছোট ছোট কারখানা। আর বিদ্যুতের সংকট তো রয়েছেই। ‘বিদ্যুতের সংকটে আমরা পঙ্গু হয়ে গেছি। আমাদের দৈনন্দিন কাজও চালাতে পারছি না। মনে হচ্ছে যেন আমরা প্রস্তর যুগে রয়েছি।’ ডনকে বলেছেন করাচির একজন গৃহবধূ মিসেস ওয়াসিম।

গবেষক আলতাফ পারভেজ সময়ের আলোকে বলেন, পাকিস্তানের নাজুক অর্থনীতির নেপথ্যে প্রথম কারণ হলো দুর্নীতি। পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা খুব দুর্নীতিগ্রস্ত। আর তাদের অর্থনীতির মূল অংশ চলে যায় সামরিক বাজেটে। এভাবেই দশকের পর দশক চলছে। বর্তমান অর্থনীতি এ ধারাটা আর নিতে পারছে না।
জবাবদিহিতাহীন অলাভজনক চীনা ঋণ : পাকিস্তানের অন্যতম বন্ধুরাষ্ট্র চীন। আইএমএফ জানাচ্ছে, পাকিস্তানের মোট বৈদেশিক ঋণের ৩০ শতাংশই চীন থেকে নেওয়া। দিল্লিভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজের গবেষক কমল মাদিশেঠী সিএনবিসিকে বলেছেন, এই চীনা ঋণগুলোর সঙ্গে অস্বচ্ছ শর্ত জড়িয়ে রয়েছে। প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা উপেক্ষা করা, পরিবেশগত এবং সামাজিক খরচ উপেক্ষা করা এবং সুদের উচ্চ হারের কারণে ঋণগুলো অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করেছে।

সিএনবিসি বলছে, ঋণের এই ফাঁদ আর বর্তমান আর্থিক অবস্থা সত্ত্বেও পাকিস্তান চীনের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ অব্যাহত রেখেছে। ‘সম্প্রতি ইসলামাবাদ একটি বড় রেল প্রকল্পের জন্য চীনের কাছ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ চেয়েছে। এই ধরনের সিদ্ধান্তগুলো অবশ্যই দেশটিকে তার ঋণের খেলাপি হওয়ার দিকে ঠেলে দেবে।’ বলেছেন মাদিশেঠী।

সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের ব্যয় : ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে তাদের ৭০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। পাকিস্তান যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ২০ বিলিয়ন ডলারের অর্থ সহায়তা পেয়েছে, সেখানে এই যুদ্ধে তাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ১৫০ বিলিয়ন ডলার। বিপুল পরিমাণের এই ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে; বলা হয়েছে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের বিশ্লেষণে।

ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, প্রতিরক্ষা খাতে পাকিস্তান লাগামহীন ব্যয় করছে। বিপুল অস্ত্র কিনতে হয়েছে। আর সেই অস্ত্র কিনতে তারা সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে।

লন্ডন ও দুবাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এশিয়ান লাইটের এক প্রতিবেদনে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নকেও অর্থনৈতিক সংকটের কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তেহরিক-ই তালেবানের মতো সংগঠনগুলোকে আর্থিক প্রণোদনা দিয়েছে সে দেশের সেনা স্টাবলিশমেন্ট।

আইএমএফের ঋণে সংকট কাটবে কী : পাকিস্তানের অর্থনীতি নিয়ে নবম পর্যালোচনার পর, অর্থাৎ ৯টি আলোচনার পর দেশটিকে ১.১ বিলিয়ন ডলার দিতে সম্মত হয়েছে আইএমএফ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি পাকিস্তানের জন্য অন্যান্য দেশ ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও দ্বিপক্ষীয় ঋণের পথকে প্রশস্ত করবে।

আইএমএফ চাচ্ছে, পাকিস্তান সরকার যেন দেশের রাজস্ব বাড়াতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এ প্রসঙ্গে ড. জাহিদ সময়ের আলোকে বলেন, ঋণ পেতে হলে তো একটা সমঝোতা হতে হবে। সমঝোতা না হলে ঋণ পাবে কী করে? আর আইএমএফ যখন ঋণ দেয় তখন সেই দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়। আর আলতাফ পারভেজ বলছেন, পাকিস্তানকে আইএমএফ ঋণ দিলেও তার একটি বড় অংশ সামরিক খাতেই চলে যাবে। এতে অর্থনৈতিক সংকটের কার্যকর কোনো সমাধান হবে না।