ঢাকা ০২:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

খেসারত দিতে হবে নিম্ন আয়ের মানুষকে

  • অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিত: ০৯:০৪:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৩
  • 153

স্টাফ রিপোর্টার: ৩৮শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ঋণের প্রথম কিস্তি পেলো বাংলাদেশ। শর্তের নামে অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোর যে সংস্কার হবে তার খেসারত দিতে হতে পারে দেশের নিম্ন আয়ের মানুষকে। এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মূল শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকঋণের সুদহারের সীমা তুলে দেওয়া, ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দিয়ে একটিই দাম ঠিক করা, জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিলিয়ে সব সময় সমন্বয় করা, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় রাজস্ব সংগ্রহের হার বৃদ্ধি, সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ কমিয়ে দেওয়া ইত্যাদি। এছাড়াও যেসব সংস্কারের ব্যাপারে আইএমএফ ও বাংলাদেশ একমত হয়েছে, সেগুলো হলো রাজস্ব সংস্কার, মুদ্রা ও বিনিময় হারের সংস্কার, আর্থিক খাতের সংস্কার, জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত সংস্কার এবং সামষ্টিক কাঠামো সংস্কার। আগামী ২০২৬ সাল পর্যন্ত এসব সংস্কার কার্যক্রম চলমান থাকলেও কিছু কাজ করতে হবে অনেকটা জরুরি ভিত্তিতে, আগামী এক বছরের মধ্যে। আন্তর্জাতিক কোন সংস্থার থেকে এতো শর্তে আগে কখনও ঋণ নিতে দেখা যায়নি। আর কোন ঋণ নিয়ে এতো আলোচনাও হয়নি। একজন রিক্সা চালকের এ ঋণের খবর জানা আছে। দেশের চলমান সংকট মোকাবেলায় এ ঋণ আনা হচ্ছে। নগদে কিছুটা লাভ হলেও মোটা দাগে বড় ক্ষতি হতে পারে। আর এর দায়ভার সাধারণ জনগণকেই নিতে হবে। ইতোমধ্যে ঋণের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে গ্যাস এবং বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দামও। এছাড়াও প্রতিদিনই কোন না কোন পণ্যের দাম বাড়ছে। যা বহন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে যেসব সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে, সেগুলো হলো এমন কর রাজস্বব্যবস্থা গ্রহণ করা, যাতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটের জিডিপির দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত কর আদায় হয়।

আইএমএফ মনে করে, পৃথিবীর যেসব দেশে কর-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে কম, বাংলাদেশ তার একটি। কর আদায় কম হওয়ায় প্রয়োজনীয় খাতে যথেষ্ট পরিমাণ বিনিয়োগ করা যায় না। তাই আগামী জুনের মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে আইএমএফ। আগামী বাজেটেই এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করতে হবে। আইএমএফ বলছে, বাড়তি অর্থ পাওয়া গেলে অগ্রাধিকারমূলক খাতগুলোতে বাংলাদেশ আরও বেশি খরচ করতে পারবে।

এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক এবং ভ্যাট বিভাগে কমপ্লায়েন্স ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিট গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। আর এটি করতে হবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে। মূলত রাজস্ব আদায় বাড়াতে এ পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। দেশজ উৎস থেকে যে পরিমাণ অর্থ বাজেট-ঘাটতি পূরণে ব্যবহার হয়, অর্থাৎ সরকার যত ঋণ করে, তার এক-চতুর্থাংশের কম নিতে হবে সঞ্চয়পত্র থেকে। সে লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়কে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সরকার প্রতিবছর বাজেটে সঞ্চয়পত্রের সুদ পরিশোধ বাবদ বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখে। আইএমএফ চায়, সরকার সঞ্চয়পত্রের সুদ খাতে খরচ কমিয়ে অগ্রাধিকার খাতে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করুক। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারকে সঞ্চয়পত্র থেকে কম ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে হবে।

আইএমএফ আরও শর্ত দিয়েছে, পেট্রোলিয়াম জাতীয় পণ্যের দাম একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর সমন্বয়ের একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করার। ডিসেম্বরের মধ্যে এ কাজটি করতে হবে। এ প্রস্তাব করা হয়েছে মূলত জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমাতে। এ পরামর্শের কারণও অভিন্ন, অগ্রাধিকারমূলক খাতের জন্য ব্যয় বাড়ানো।

আইএমএফ গত সোমবার বাংলাদেশের জন্য ঋণ কর্মসূচি অনুমোদন করে বৃহস্পতিবার সময়বদ্ধ শর্তগুলো প্রকাশ করেছে। কোন সময়ে বাংলাদেশকে কী করতে হবে, তাও বলে দিয়েছে সংস্থাটি। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার যৌথভাবে গত ২৩ ডিসেম্বর আইএমএফকে যে চিঠি দিয়েছেন, তাও তুলে ধরেছে আইএমএফ। চিঠিতে আইএমএফের শর্তগুলো মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী ও গবর্নর।

অর্থমন্ত্রী ও গবর্নর আইএমএফকে জানিয়েছে, ঋণ কর্মসূচি চলাকালে সাড়ে তিন বছরে এমন সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যাতে মূল্যস্ফীতি ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে নেমে আসে। আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকবে চার মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান।

অথচ অর্থনীতিবিদ ও গবেষকেরা বলছেন, ব্যাংকঋণের সুদহারের সীমা তুলে দিলে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ বাড়িয়ে দেবে। এতে পণ্য ও সেবা উৎপাদনের খরচ বাড়বে। তাতে পণ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে, যার ভুক্তভোগী হবেন সাধারণ মানুষ।

বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি হলে ডলারের দর বাজারভিত্তিক ও একটি দাম নির্ধারণ করা হবে। ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে এক লাফে তা অনেক বেড়ে যাবে এবং ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি মুদ্রা টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হতে পারে। তখন পণ্য আমদানিতে খরচ আরও বেড়ে যেতে পারে, যা মূল্যস্ফীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ঋণের সুদ বাজারভিত্তিক করার কথা আইএমএফ সরাসরি বলেনি। তবে আইএমএফ বলুক না বলুক, এটা বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই বাঞ্ছনীয়। আর ডলারের দর একটি হওয়াও বাঞ্ছনীয়। তিনি আরও বলেন, আইএমএফের সব শর্ত বিশ্লেষণ করলে কঠিন তেমন কিছু নেই। কর-প্রশাসন থেকে কর-নীতি আলাদা করার সংস্কারের কথা যদি থাকত, তাহলে একটা ভালো কাজ হতো।

এদিকে কর-জিডিপির হার ঋণ প্রাপ্তির প্রথম দুই বছর দশমিক ৫০ শতাংশ ও পরের বছর দশমিক ৭০ শতাংশ হারে বৃদ্ধির কথা বলেছে আইএমএফ। দেশের রাজস্ব প্রশাসনের প্রবণতা হচ্ছে, যারা কর দেন, তাদের ওপরই বাড়তি করের বোঝা চাপানো। আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে সরকার সে পথেই যাবে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা।

জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুতের দাম ইতিমধ্যে সরকার বাড়িয়েছে, যার প্রভাব জিনিসপত্রের দামের ওপর পড়েছে। এগুলোতে সরকার আর ভর্তুকি দিতে রাজি নয়। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে বর্তমানে যে জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক বাজারদরের কাছাকাছিই আছে। সারে অবশ্য ভর্তুকি বহাল আছে এবং থাকবেও। এ ব্যাপারে আইএমএফও কিছু বলেনি।

আর সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে প্রতিবছর অভ্যন্তরীণ ঋণের যতটুকু সংগ্রহ করে সরকার, তা এক-চতুর্থাংশে নামিয়ে আনার কথা বলেছে আইএমএফ। অর্থমন্ত্রী ও গবর্নর এতে রাজি বলে চিঠিতে উল্লেখ করেছেন। মুনাফা থেকে কর কেটে রাখার বাধ্যবাধকতা আরোপ করায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ এখন এমনিতেই কম। আইএমএফের পরামর্শ মেনে সরকার এখন আরও কিছু বিধিবিধান তৈরি করবে, যাতে সঞ্চয়পত্র বিক্রি চূড়ান্ত বিচারেই তলানিতে নামবে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, যতটুকু বুঝলাম সংস্কার করার জন্য আইএমএফের তালিকাটা অনেক লম্বা হয়ে গেল। সংস্কার দরকার। তবে অর্থনীতি এখন যে ক্রান্তিকালের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে, আইএমএফের পরামর্শ মানতে গেলে মূল্যস্ফীতি তো কমবেই না, উল্টো বেড়ে যেতে পারে।

সেলিম রায়হান বলেন, ৪৭০ কোটি ডলার এমন বড় কোনো অর্থ নয়। সময়মতো সংস্কারের কাজগুলো আমরা করিনি বলেই চাপটা এত বড় হলো। ভয় হয় চাপটা বহন করা যাবে কি না। আর ভর্তুকি কমানো, সুদের হার বৃদ্ধি, ডলারের এক দর করাসহ সব ধরনের সংস্কারেরই একটা মূল্য ও ব্যথা আছে। এ ব্যথা বহন করতে হয় শেষ পর্যন্ত জনগণকে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষকে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলেও যেটা দেখা গেছে। সংস্কারের মূল্যটা গরিব মানুষের বদলে সুবিধাভোগী শ্রেণির ওপরও পড়ুক, এ ব্যাপারে আমরা সরকারের সাহসী ভূমিকা দেখতে চাই।

বিষয় :
প্রতিবেদক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য

অনলাইন ডেস্ক

জনপ্রিয়

খেসারত দিতে হবে নিম্ন আয়ের মানুষকে

প্রকাশিত: ০৯:০৪:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৩

স্টাফ রিপোর্টার: ৩৮শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ঋণের প্রথম কিস্তি পেলো বাংলাদেশ। শর্তের নামে অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোর যে সংস্কার হবে তার খেসারত দিতে হতে পারে দেশের নিম্ন আয়ের মানুষকে। এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মূল শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকঋণের সুদহারের সীমা তুলে দেওয়া, ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দিয়ে একটিই দাম ঠিক করা, জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিলিয়ে সব সময় সমন্বয় করা, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় রাজস্ব সংগ্রহের হার বৃদ্ধি, সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ কমিয়ে দেওয়া ইত্যাদি। এছাড়াও যেসব সংস্কারের ব্যাপারে আইএমএফ ও বাংলাদেশ একমত হয়েছে, সেগুলো হলো রাজস্ব সংস্কার, মুদ্রা ও বিনিময় হারের সংস্কার, আর্থিক খাতের সংস্কার, জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত সংস্কার এবং সামষ্টিক কাঠামো সংস্কার। আগামী ২০২৬ সাল পর্যন্ত এসব সংস্কার কার্যক্রম চলমান থাকলেও কিছু কাজ করতে হবে অনেকটা জরুরি ভিত্তিতে, আগামী এক বছরের মধ্যে। আন্তর্জাতিক কোন সংস্থার থেকে এতো শর্তে আগে কখনও ঋণ নিতে দেখা যায়নি। আর কোন ঋণ নিয়ে এতো আলোচনাও হয়নি। একজন রিক্সা চালকের এ ঋণের খবর জানা আছে। দেশের চলমান সংকট মোকাবেলায় এ ঋণ আনা হচ্ছে। নগদে কিছুটা লাভ হলেও মোটা দাগে বড় ক্ষতি হতে পারে। আর এর দায়ভার সাধারণ জনগণকেই নিতে হবে। ইতোমধ্যে ঋণের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে গ্যাস এবং বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দামও। এছাড়াও প্রতিদিনই কোন না কোন পণ্যের দাম বাড়ছে। যা বহন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে যেসব সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে, সেগুলো হলো এমন কর রাজস্বব্যবস্থা গ্রহণ করা, যাতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটের জিডিপির দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত কর আদায় হয়।

আইএমএফ মনে করে, পৃথিবীর যেসব দেশে কর-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে কম, বাংলাদেশ তার একটি। কর আদায় কম হওয়ায় প্রয়োজনীয় খাতে যথেষ্ট পরিমাণ বিনিয়োগ করা যায় না। তাই আগামী জুনের মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে আইএমএফ। আগামী বাজেটেই এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করতে হবে। আইএমএফ বলছে, বাড়তি অর্থ পাওয়া গেলে অগ্রাধিকারমূলক খাতগুলোতে বাংলাদেশ আরও বেশি খরচ করতে পারবে।

এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক এবং ভ্যাট বিভাগে কমপ্লায়েন্স ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিট গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। আর এটি করতে হবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে। মূলত রাজস্ব আদায় বাড়াতে এ পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। দেশজ উৎস থেকে যে পরিমাণ অর্থ বাজেট-ঘাটতি পূরণে ব্যবহার হয়, অর্থাৎ সরকার যত ঋণ করে, তার এক-চতুর্থাংশের কম নিতে হবে সঞ্চয়পত্র থেকে। সে লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়কে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সরকার প্রতিবছর বাজেটে সঞ্চয়পত্রের সুদ পরিশোধ বাবদ বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখে। আইএমএফ চায়, সরকার সঞ্চয়পত্রের সুদ খাতে খরচ কমিয়ে অগ্রাধিকার খাতে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করুক। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারকে সঞ্চয়পত্র থেকে কম ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে হবে।

আইএমএফ আরও শর্ত দিয়েছে, পেট্রোলিয়াম জাতীয় পণ্যের দাম একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর সমন্বয়ের একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করার। ডিসেম্বরের মধ্যে এ কাজটি করতে হবে। এ প্রস্তাব করা হয়েছে মূলত জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমাতে। এ পরামর্শের কারণও অভিন্ন, অগ্রাধিকারমূলক খাতের জন্য ব্যয় বাড়ানো।

আইএমএফ গত সোমবার বাংলাদেশের জন্য ঋণ কর্মসূচি অনুমোদন করে বৃহস্পতিবার সময়বদ্ধ শর্তগুলো প্রকাশ করেছে। কোন সময়ে বাংলাদেশকে কী করতে হবে, তাও বলে দিয়েছে সংস্থাটি। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার যৌথভাবে গত ২৩ ডিসেম্বর আইএমএফকে যে চিঠি দিয়েছেন, তাও তুলে ধরেছে আইএমএফ। চিঠিতে আইএমএফের শর্তগুলো মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী ও গবর্নর।

অর্থমন্ত্রী ও গবর্নর আইএমএফকে জানিয়েছে, ঋণ কর্মসূচি চলাকালে সাড়ে তিন বছরে এমন সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যাতে মূল্যস্ফীতি ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে নেমে আসে। আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকবে চার মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান।

অথচ অর্থনীতিবিদ ও গবেষকেরা বলছেন, ব্যাংকঋণের সুদহারের সীমা তুলে দিলে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ বাড়িয়ে দেবে। এতে পণ্য ও সেবা উৎপাদনের খরচ বাড়বে। তাতে পণ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে, যার ভুক্তভোগী হবেন সাধারণ মানুষ।

বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি হলে ডলারের দর বাজারভিত্তিক ও একটি দাম নির্ধারণ করা হবে। ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে এক লাফে তা অনেক বেড়ে যাবে এবং ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি মুদ্রা টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হতে পারে। তখন পণ্য আমদানিতে খরচ আরও বেড়ে যেতে পারে, যা মূল্যস্ফীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ঋণের সুদ বাজারভিত্তিক করার কথা আইএমএফ সরাসরি বলেনি। তবে আইএমএফ বলুক না বলুক, এটা বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই বাঞ্ছনীয়। আর ডলারের দর একটি হওয়াও বাঞ্ছনীয়। তিনি আরও বলেন, আইএমএফের সব শর্ত বিশ্লেষণ করলে কঠিন তেমন কিছু নেই। কর-প্রশাসন থেকে কর-নীতি আলাদা করার সংস্কারের কথা যদি থাকত, তাহলে একটা ভালো কাজ হতো।

এদিকে কর-জিডিপির হার ঋণ প্রাপ্তির প্রথম দুই বছর দশমিক ৫০ শতাংশ ও পরের বছর দশমিক ৭০ শতাংশ হারে বৃদ্ধির কথা বলেছে আইএমএফ। দেশের রাজস্ব প্রশাসনের প্রবণতা হচ্ছে, যারা কর দেন, তাদের ওপরই বাড়তি করের বোঝা চাপানো। আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে সরকার সে পথেই যাবে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা।

জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুতের দাম ইতিমধ্যে সরকার বাড়িয়েছে, যার প্রভাব জিনিসপত্রের দামের ওপর পড়েছে। এগুলোতে সরকার আর ভর্তুকি দিতে রাজি নয়। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে বর্তমানে যে জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক বাজারদরের কাছাকাছিই আছে। সারে অবশ্য ভর্তুকি বহাল আছে এবং থাকবেও। এ ব্যাপারে আইএমএফও কিছু বলেনি।

আর সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে প্রতিবছর অভ্যন্তরীণ ঋণের যতটুকু সংগ্রহ করে সরকার, তা এক-চতুর্থাংশে নামিয়ে আনার কথা বলেছে আইএমএফ। অর্থমন্ত্রী ও গবর্নর এতে রাজি বলে চিঠিতে উল্লেখ করেছেন। মুনাফা থেকে কর কেটে রাখার বাধ্যবাধকতা আরোপ করায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ এখন এমনিতেই কম। আইএমএফের পরামর্শ মেনে সরকার এখন আরও কিছু বিধিবিধান তৈরি করবে, যাতে সঞ্চয়পত্র বিক্রি চূড়ান্ত বিচারেই তলানিতে নামবে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, যতটুকু বুঝলাম সংস্কার করার জন্য আইএমএফের তালিকাটা অনেক লম্বা হয়ে গেল। সংস্কার দরকার। তবে অর্থনীতি এখন যে ক্রান্তিকালের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে, আইএমএফের পরামর্শ মানতে গেলে মূল্যস্ফীতি তো কমবেই না, উল্টো বেড়ে যেতে পারে।

সেলিম রায়হান বলেন, ৪৭০ কোটি ডলার এমন বড় কোনো অর্থ নয়। সময়মতো সংস্কারের কাজগুলো আমরা করিনি বলেই চাপটা এত বড় হলো। ভয় হয় চাপটা বহন করা যাবে কি না। আর ভর্তুকি কমানো, সুদের হার বৃদ্ধি, ডলারের এক দর করাসহ সব ধরনের সংস্কারেরই একটা মূল্য ও ব্যথা আছে। এ ব্যথা বহন করতে হয় শেষ পর্যন্ত জনগণকে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষকে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলেও যেটা দেখা গেছে। সংস্কারের মূল্যটা গরিব মানুষের বদলে সুবিধাভোগী শ্রেণির ওপরও পড়ুক, এ ব্যাপারে আমরা সরকারের সাহসী ভূমিকা দেখতে চাই।