ঢাকা ০৯:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ মে ২০২৪, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

মেগা প্রজেক্টের চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষ!

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : দেশের মেগা প্রজেক্ট গুলোর চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষ। এমন মন্তব্য বিশিষ্টজনদের। তারা বলছেন, যেকোনো দেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধির সঙ্গে ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন একটি অপরিহার্য শর্ত। যেমন-পদ্মা সেতু চালু হওয়ার কারণে আশা করা যাচ্ছে জিডিপিতে ১ দশমিক ২ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে। কিন্তু প্রশ্ন যেটা থেকে যায় তা হলো, এ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বণ্টন সাধারণ মানুষ সমহারে পাবে কিনা কিংবা পাচ্ছে কিনা। কারণ আমাদের মতো শাসনব্যবস্থায় সম্পদ যত বাড়ে, বৈষম্যও তত বাড়ে। অন্তত বিগত ৫০ বছরের অতীত তা-ই বলে। তারা বলছেন, মেগাপ্রজেক্টগুলো থেকে সাধারণ মানুষ তেমন সুফল পাচ্ছে না। বরং তারা এসব প্রকল্পের চাপে পিষ্ট হচ্ছে। এটি আশীর্বাদের পরিবর্তে কষ্ট বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং চাহিদাকে মাথায় রেখে অবকাঠামো নির্মাণ করলে তো কোনো সমস্যা ছিল না। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে চীন বা ভারতের তুলনায় তো বটেই, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের মতো ধনী দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সব ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ খরচ বেশি। সেতু থেকে শুরু করে সড়ক সব খাতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। তাই অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে যদি চুরি বা দুর্নীতি বেশি গুরুত্ব পায়, তাহলে তা জনগণের কোনো কাজে আসে না।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, সরকার থেকে বলা হয়, এসব প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থে। বলা হয়, বিশ্বব্যাংক-এডিবির মতো প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে এগুলো করা হচ্ছে। কিন্তু এসব সংস্থার দেওয়া অর্থ দিন শেষে জনগণের দেওয়া কর ও আয় থেকে নেওয়া হয়। আর বাস্তবে আমরা এমন সব প্রকল্প নিতে দেখেছি, যেগুলো জনগণের স্বার্থে কোনো কাজে লাগে না। বরং জনগণের ওপরে করের বোঝা বাড়ানো হয়। সুন্দরবনের পাশে রামপাল, পাবনায় রূপপুর ও পটুয়াখালীতে পায়রা কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো প্রকল্পগুলো দিন শেষে জনগণের বিপক্ষে যায়। এসব প্রকল্পের কারণে সুন্দরবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি হতে আমরা দেখেছি। এই বাজেটেও সরকার মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ রেখেছে, যা আসলে জনগণের কোনো কাজে আসবে না, বরং দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের ওপরে করের বোঝা বাড়াবে। যেমন দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য এক লাখ কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে। এই টাকা রাশিয়া দিলেও তা আবার জনগণের কাছ থেকে আদায় করে সুদসহ ফেরত দিতে হবে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্প দেশের পরিবেশের ক্ষতি করছে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার এ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থাৎ দেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। বিদেশ থেকে বাকি দেড় লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে, যা বাজেট বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আরও বাড়তে পারে। এই ঋণের বড় অংশ নেওয়া হয়েছে মেগা প্রকল্পের জন্য। এসব ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে এবারের বাজেটে নতুন নতুন খাতে করের বোঝা চাপানো হয়েছে।

বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মুঈদ রহমান বলেন, মানুষের আয়-বৈষম্যকে বিশেষজ্ঞরা যা দিয়ে পরিমাপ করেন, তার নাম ‘জিনি সহগ’। এর মান যদি ০ হয়, তাহলে বুঝতে হবে সেই অর্থনীতিতে আয় সম্পূর্ণ সমভাবে বণ্টিত। আর যদি মান ১ হয়, তাহলে বুঝতে হবে সব আয় একজনের হাতে পুঞ্জীভূত। বাস্তবে এর কোনোটিই হয় না। তাই জিনি সহগের মান ০ থেকে যতই ১-এর দিকে ধাবিত হবে, ধরে নিতে হবে সেই অর্থনীতিতে বৈষম্য ততই বাড়ছে। স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুতে এই সহগের মান ছিল ০.৩৩; বর্তমানে এর মান ০.৪৮। এতে বোঝাই যাচ্ছে যে আয়-বৈষম্য বাড়ছে। সমৃদ্ধির সুফল সবাই ভোগ করতে পারছে না, পারছে গুটিকয়েক মানুষ। তিনি আরও বলেন, সরকারি পর্যায় থেকে বিভিন্ন জিনিসের দাম বাড়ানোর যুক্তি দেখানো হয়, কিন্তু সীমিত আয়ের মানুষ কোথা থেকে সেই অর্থ জোগাড় করবে তার কোনো পথ দেখানো হচ্ছে না। আমাদের দুর্বলতা হলো, প্রতিবাদের ভাষা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আর সরকার সাধারণ মানুষের এ অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি সাধারণ মানুষের উপর অনেক কষ্টের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হলো। এর ফলে মূল্যস্ফীতির অধিকতর চাপে পিষ্ট হবে সাধরণ মানুষ, যাদের কথা ভাবার কেউ নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি মহলের পক্ষ থেকে মেগা প্রকল্পগুলোর সফলতার চিত্র যতটা ফলাও করে প্রচার করতে দেখা যায়, সাধারণ মানুষের মহাদুর্ভোগের সামান্য উপলব্ধিও প্রকাশ পেতে দেখা যায় না। বরং লোকসানের অজুহাতে দফায় দফায় বৃদ্ধি করা হচ্ছে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম। আগস্টে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে, ডিসেম্বরে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে, যা ভোক্তা পর্যায়ে ১২ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। এরপর বাড়ানো হয়েছে গ্যাসের দাম। এক মাস যেতে না যেতে বিদ্যুতের দাম আরেক দফা বাড়ানো হয়েছে। ফের বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সম্ভানার বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য হলো, ‘জ্বালানি তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরে আসতে চায় সরকার। বিশেষ করে ডিজেলচালিত সব বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হবে। এতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে হবে। শিল্পেও বাড়তি গ্যাসের দরকার। এ কারণে আমদানি বাড়াতে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। এখন বিদ্যুতের দাম কিছুটা সমন্বয় করার প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত দাম সমন্বয় করা হবে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সূত্র বলছে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত ৮টি মেগা প্রকল্পের গড় অগ্রগতি হয়েছে ৭৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ। উল্লেখিত প্রকল্পগুলোতে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। তবে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন করতে মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৬ হাজার ২৬৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। অগ্রাধিকার পাওয়া ৮টি মেগা প্রকল্প হলো- পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ এবং দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার-ঘুমধুম (মিয়ানমারের কাছে) পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প। অনেক প্রকল্পই পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের আগেই উদ্বোধন করা হয়। কিছু কিছু কাজ বাকি থেকে যায়। যেমন-পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হয়েছে গেল বছরের ২৫ জুন। সেতুর উপর দিয়ে যানবাহন চলাচলও করছে নির্বিঘেœ। কিন্তু প্রকল্পটির নদীশাসনসহ আনুষঙ্গিক কিছু কাজ এখনো চলমান। আইএমইডির প্রতিবেদন বলছে, এখন পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ বাকি রয়েছে ৪ দশমিক ২ শতাংশ। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটির আওতায় ব্যয় হয়েছে ২৮ হাজার ৫৩৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৯৪ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং ভৌত অবকাঠামোগত অগ্রগতি হয়েছে ৯৫ দশমিক ৮ শতাংশ। কয়েক দফা প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে এবং সর্বশেষ মেয়াদে কাজটি ২০২৩ সালের জুন মাসে সম্পন্ন হওয়ার কথা। মেট্টোরেল প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়েছে গত ২৮ ডিসেম্বর। পরীক্ষামূলকভাবে এ ব্যবস্থাপনায় যাত্রী পরিবহণের কাজটিও চলছে। তবে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্টোরেলের কাজটি আংশিক। প্রকল্পটির পুরো বাস্তবায়ন হলে উত্তরা থেকে মতিঝিল এবং সম্প্রসারিতভাবে কমলাপুর পর্যন্ত যাত্রী পরিবহণ সম্ভব হবে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরে মতিঝিল পর্যন্ত অংশের কাজ শেষ হবে এবং কমলাপুর পর্যন্ত সময় লাগবে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ব্যয় করা হয়েছে ২১ হাজার ১১৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। সে হিসাবে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৬৩ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে প্রকল্পটির ভৌতিক অগ্রগতি হয়েছে ৭০ শতাংশ। তথ্য অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে শুরু থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৫৮ হাজার ২৬৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৫১ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৫৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ। সময় বাড়িয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ ধার্য করা হয়েছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। আরেকটি বড় প্রকল্প হলো পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার কথা। শুরু থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ২৬ হাজার ৩৬৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। সেই অর্থে প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৬৭ দশমিক ১৮ শতাংশ, আর ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রকল্পটি শেষ করতে মোট ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রকল্পটি ২০২৬ সালে জুনে সম্পন্ন হওয়ার কথা। শুরু থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ২৯ হাজার ৫৫১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এতে করে আর্থিক অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে ৫৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ভৌত অগ্রগতির হার দাঁড়িয়েছে ৭০ দশমিক ৭৬ শতাংশে। ১৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ের প্রকল্পটি হলো রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প। প্রকল্পটিতে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১২ হাজার ৮৯৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আর্থিক অগ্রগতির দিক থেকে প্রকল্পটি এগিয়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ। পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৮২ শতাংশে এবং ভৌত অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৮৮ শতাংশ। দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু-মিয়ানমারের কাছে ঘুনধুম রেল ট্র্যাক নির্মাণ কাজের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। শুরু থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ৭ হাজার ২১৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এ অর্থে প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়ায় প্রায় ৪০ শতাংশে এবং ভৌত অগ্রগতি দাঁড়ায় ৭৮ শতাংশে।

প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলমের বক্তব্য হলো, ‘বাস্তবায়ন ভালোই হচ্ছে। চলমান ডলার ও আর্থিক সংকট এসব প্রকল্পগুলোকে যাতে ছুঁতে না পারে, সেজন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। প্রয়োজনে অন্য প্রকল্প বা খাতের ব্যয় কমিয়ে হলেও এসব প্রকল্পের জন্য অর্থ জোগান দেওয়া হচ্ছে। তারপরও যদি কোথাও কোনো সমস্যা থেকে থাকে, সেগুলো সমাধানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবাই চায় প্রকল্পের যথাসময়ে এবং যথাযথ বাস্তবায়ন। কারণ নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্পের কাজ সমাধা করতে না পারলে এর আর্থিক দায় অনেকখানি বেড়ে যায়। যা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।

মেগা প্রকল্পের অর্থে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের উন্নতি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান। তিনি বলেন, আজকে মেগা প্রকল্প থেকে যে অর্থ লুট হচ্ছে, তার মাধ্যমে দুর্নীতি করে দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ২০০৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ১৯টি মেগা প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করা হয়েছে। এই মেগা প্রকল্পের উন্নয়নে সাধারণ মানুষের উন্নয়ন হচ্ছে না, তারা শুধু হয়রানির শিকার হয়েছে, তাদের অর্থ লুট করা হচ্ছে। মেগা প্রকল্পের টাকার অংশীদার হয়েছে আওয়ামী লীগ, অংশীদার হয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা, অংশীদার হয়েছেন শেখ হাসিনা। বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, এই উন্নয়ন আসলে উন্নয়ন নয়। এটা অস্বাভাবিকভাবে মানুষ যেমন মোটা হয়ে যায়, শরীরে চর্বি জমে, এক্সট্রা চর্বি। ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের যে উন্নয়নের কথা সরকার বলছে, একটা শ্রেণি বা গোষ্ঠীর উন্নয়ন হচ্ছে। এই উন্নয়ন সাধারণ মানুষের নয়, এই উন্নয়ন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উন্নয়ন। এর ফলে আজকে দেশ এমন একটা পরিস্থিতিতে পড়েছে, যেখানে মানুষ দুই বেলা খাওয়ার জন্য তার যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সংস্থান করা প্রয়োজন সেটাও করতে পারছে না। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ সরকারের পতন বলে উল্লেখ করেন নোমান।

বিজ্ঞান ও কারিগরি পরামর্শদাতা মিফতাহুর রহমান বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও স্বপ্ন ছিল একটি আধুনিক রাষ্ট্রের। দেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে আজও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সাধারণ মানুষ তাদের অপরিসীম ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর অনেক কিছুই নীরবে সহ্য করে যাচ্ছে। দেশের নেতাদের কাছে তাদের প্রত্যাশা, তারা এ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আশা-আকাক্সক্ষাকে গুরুত্ব দেবেন। কিন্তু সেটি এখন দেখা যাচ্ছে না।

বিষয় :
প্রতিবেদক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য

অনলাইন ডেস্ক

জনপ্রিয়

মেগা প্রজেক্টের চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষ!

প্রকাশিত: ০৭:০৬:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৩

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : দেশের মেগা প্রজেক্ট গুলোর চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষ। এমন মন্তব্য বিশিষ্টজনদের। তারা বলছেন, যেকোনো দেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধির সঙ্গে ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন একটি অপরিহার্য শর্ত। যেমন-পদ্মা সেতু চালু হওয়ার কারণে আশা করা যাচ্ছে জিডিপিতে ১ দশমিক ২ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে। কিন্তু প্রশ্ন যেটা থেকে যায় তা হলো, এ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বণ্টন সাধারণ মানুষ সমহারে পাবে কিনা কিংবা পাচ্ছে কিনা। কারণ আমাদের মতো শাসনব্যবস্থায় সম্পদ যত বাড়ে, বৈষম্যও তত বাড়ে। অন্তত বিগত ৫০ বছরের অতীত তা-ই বলে। তারা বলছেন, মেগাপ্রজেক্টগুলো থেকে সাধারণ মানুষ তেমন সুফল পাচ্ছে না। বরং তারা এসব প্রকল্পের চাপে পিষ্ট হচ্ছে। এটি আশীর্বাদের পরিবর্তে কষ্ট বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং চাহিদাকে মাথায় রেখে অবকাঠামো নির্মাণ করলে তো কোনো সমস্যা ছিল না। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে চীন বা ভারতের তুলনায় তো বটেই, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের মতো ধনী দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সব ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ খরচ বেশি। সেতু থেকে শুরু করে সড়ক সব খাতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। তাই অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে যদি চুরি বা দুর্নীতি বেশি গুরুত্ব পায়, তাহলে তা জনগণের কোনো কাজে আসে না।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, সরকার থেকে বলা হয়, এসব প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থে। বলা হয়, বিশ্বব্যাংক-এডিবির মতো প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে এগুলো করা হচ্ছে। কিন্তু এসব সংস্থার দেওয়া অর্থ দিন শেষে জনগণের দেওয়া কর ও আয় থেকে নেওয়া হয়। আর বাস্তবে আমরা এমন সব প্রকল্প নিতে দেখেছি, যেগুলো জনগণের স্বার্থে কোনো কাজে লাগে না। বরং জনগণের ওপরে করের বোঝা বাড়ানো হয়। সুন্দরবনের পাশে রামপাল, পাবনায় রূপপুর ও পটুয়াখালীতে পায়রা কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো প্রকল্পগুলো দিন শেষে জনগণের বিপক্ষে যায়। এসব প্রকল্পের কারণে সুন্দরবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি হতে আমরা দেখেছি। এই বাজেটেও সরকার মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ রেখেছে, যা আসলে জনগণের কোনো কাজে আসবে না, বরং দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের ওপরে করের বোঝা বাড়াবে। যেমন দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য এক লাখ কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে। এই টাকা রাশিয়া দিলেও তা আবার জনগণের কাছ থেকে আদায় করে সুদসহ ফেরত দিতে হবে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্প দেশের পরিবেশের ক্ষতি করছে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার এ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থাৎ দেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। বিদেশ থেকে বাকি দেড় লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে, যা বাজেট বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আরও বাড়তে পারে। এই ঋণের বড় অংশ নেওয়া হয়েছে মেগা প্রকল্পের জন্য। এসব ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে এবারের বাজেটে নতুন নতুন খাতে করের বোঝা চাপানো হয়েছে।

বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মুঈদ রহমান বলেন, মানুষের আয়-বৈষম্যকে বিশেষজ্ঞরা যা দিয়ে পরিমাপ করেন, তার নাম ‘জিনি সহগ’। এর মান যদি ০ হয়, তাহলে বুঝতে হবে সেই অর্থনীতিতে আয় সম্পূর্ণ সমভাবে বণ্টিত। আর যদি মান ১ হয়, তাহলে বুঝতে হবে সব আয় একজনের হাতে পুঞ্জীভূত। বাস্তবে এর কোনোটিই হয় না। তাই জিনি সহগের মান ০ থেকে যতই ১-এর দিকে ধাবিত হবে, ধরে নিতে হবে সেই অর্থনীতিতে বৈষম্য ততই বাড়ছে। স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুতে এই সহগের মান ছিল ০.৩৩; বর্তমানে এর মান ০.৪৮। এতে বোঝাই যাচ্ছে যে আয়-বৈষম্য বাড়ছে। সমৃদ্ধির সুফল সবাই ভোগ করতে পারছে না, পারছে গুটিকয়েক মানুষ। তিনি আরও বলেন, সরকারি পর্যায় থেকে বিভিন্ন জিনিসের দাম বাড়ানোর যুক্তি দেখানো হয়, কিন্তু সীমিত আয়ের মানুষ কোথা থেকে সেই অর্থ জোগাড় করবে তার কোনো পথ দেখানো হচ্ছে না। আমাদের দুর্বলতা হলো, প্রতিবাদের ভাষা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আর সরকার সাধারণ মানুষের এ অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি সাধারণ মানুষের উপর অনেক কষ্টের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হলো। এর ফলে মূল্যস্ফীতির অধিকতর চাপে পিষ্ট হবে সাধরণ মানুষ, যাদের কথা ভাবার কেউ নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি মহলের পক্ষ থেকে মেগা প্রকল্পগুলোর সফলতার চিত্র যতটা ফলাও করে প্রচার করতে দেখা যায়, সাধারণ মানুষের মহাদুর্ভোগের সামান্য উপলব্ধিও প্রকাশ পেতে দেখা যায় না। বরং লোকসানের অজুহাতে দফায় দফায় বৃদ্ধি করা হচ্ছে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম। আগস্টে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে, ডিসেম্বরে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে, যা ভোক্তা পর্যায়ে ১২ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। এরপর বাড়ানো হয়েছে গ্যাসের দাম। এক মাস যেতে না যেতে বিদ্যুতের দাম আরেক দফা বাড়ানো হয়েছে। ফের বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সম্ভানার বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য হলো, ‘জ্বালানি তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরে আসতে চায় সরকার। বিশেষ করে ডিজেলচালিত সব বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হবে। এতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে হবে। শিল্পেও বাড়তি গ্যাসের দরকার। এ কারণে আমদানি বাড়াতে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। এখন বিদ্যুতের দাম কিছুটা সমন্বয় করার প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত দাম সমন্বয় করা হবে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সূত্র বলছে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত ৮টি মেগা প্রকল্পের গড় অগ্রগতি হয়েছে ৭৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ। উল্লেখিত প্রকল্পগুলোতে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। তবে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন করতে মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৬ হাজার ২৬৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। অগ্রাধিকার পাওয়া ৮টি মেগা প্রকল্প হলো- পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ এবং দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার-ঘুমধুম (মিয়ানমারের কাছে) পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প। অনেক প্রকল্পই পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের আগেই উদ্বোধন করা হয়। কিছু কিছু কাজ বাকি থেকে যায়। যেমন-পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হয়েছে গেল বছরের ২৫ জুন। সেতুর উপর দিয়ে যানবাহন চলাচলও করছে নির্বিঘেœ। কিন্তু প্রকল্পটির নদীশাসনসহ আনুষঙ্গিক কিছু কাজ এখনো চলমান। আইএমইডির প্রতিবেদন বলছে, এখন পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ বাকি রয়েছে ৪ দশমিক ২ শতাংশ। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটির আওতায় ব্যয় হয়েছে ২৮ হাজার ৫৩৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৯৪ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং ভৌত অবকাঠামোগত অগ্রগতি হয়েছে ৯৫ দশমিক ৮ শতাংশ। কয়েক দফা প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে এবং সর্বশেষ মেয়াদে কাজটি ২০২৩ সালের জুন মাসে সম্পন্ন হওয়ার কথা। মেট্টোরেল প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়েছে গত ২৮ ডিসেম্বর। পরীক্ষামূলকভাবে এ ব্যবস্থাপনায় যাত্রী পরিবহণের কাজটিও চলছে। তবে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্টোরেলের কাজটি আংশিক। প্রকল্পটির পুরো বাস্তবায়ন হলে উত্তরা থেকে মতিঝিল এবং সম্প্রসারিতভাবে কমলাপুর পর্যন্ত যাত্রী পরিবহণ সম্ভব হবে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরে মতিঝিল পর্যন্ত অংশের কাজ শেষ হবে এবং কমলাপুর পর্যন্ত সময় লাগবে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ব্যয় করা হয়েছে ২১ হাজার ১১৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। সে হিসাবে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৬৩ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে প্রকল্পটির ভৌতিক অগ্রগতি হয়েছে ৭০ শতাংশ। তথ্য অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে শুরু থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৫৮ হাজার ২৬৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৫১ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৫৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ। সময় বাড়িয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ ধার্য করা হয়েছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। আরেকটি বড় প্রকল্প হলো পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার কথা। শুরু থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ২৬ হাজার ৩৬৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। সেই অর্থে প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৬৭ দশমিক ১৮ শতাংশ, আর ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রকল্পটি শেষ করতে মোট ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রকল্পটি ২০২৬ সালে জুনে সম্পন্ন হওয়ার কথা। শুরু থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ২৯ হাজার ৫৫১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এতে করে আর্থিক অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে ৫৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ভৌত অগ্রগতির হার দাঁড়িয়েছে ৭০ দশমিক ৭৬ শতাংশে। ১৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ের প্রকল্পটি হলো রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প। প্রকল্পটিতে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১২ হাজার ৮৯৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আর্থিক অগ্রগতির দিক থেকে প্রকল্পটি এগিয়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ। পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৮২ শতাংশে এবং ভৌত অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৮৮ শতাংশ। দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু-মিয়ানমারের কাছে ঘুনধুম রেল ট্র্যাক নির্মাণ কাজের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। শুরু থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ৭ হাজার ২১৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এ অর্থে প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়ায় প্রায় ৪০ শতাংশে এবং ভৌত অগ্রগতি দাঁড়ায় ৭৮ শতাংশে।

প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলমের বক্তব্য হলো, ‘বাস্তবায়ন ভালোই হচ্ছে। চলমান ডলার ও আর্থিক সংকট এসব প্রকল্পগুলোকে যাতে ছুঁতে না পারে, সেজন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। প্রয়োজনে অন্য প্রকল্প বা খাতের ব্যয় কমিয়ে হলেও এসব প্রকল্পের জন্য অর্থ জোগান দেওয়া হচ্ছে। তারপরও যদি কোথাও কোনো সমস্যা থেকে থাকে, সেগুলো সমাধানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবাই চায় প্রকল্পের যথাসময়ে এবং যথাযথ বাস্তবায়ন। কারণ নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্পের কাজ সমাধা করতে না পারলে এর আর্থিক দায় অনেকখানি বেড়ে যায়। যা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।

মেগা প্রকল্পের অর্থে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের উন্নতি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান। তিনি বলেন, আজকে মেগা প্রকল্প থেকে যে অর্থ লুট হচ্ছে, তার মাধ্যমে দুর্নীতি করে দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ২০০৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ১৯টি মেগা প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করা হয়েছে। এই মেগা প্রকল্পের উন্নয়নে সাধারণ মানুষের উন্নয়ন হচ্ছে না, তারা শুধু হয়রানির শিকার হয়েছে, তাদের অর্থ লুট করা হচ্ছে। মেগা প্রকল্পের টাকার অংশীদার হয়েছে আওয়ামী লীগ, অংশীদার হয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা, অংশীদার হয়েছেন শেখ হাসিনা। বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, এই উন্নয়ন আসলে উন্নয়ন নয়। এটা অস্বাভাবিকভাবে মানুষ যেমন মোটা হয়ে যায়, শরীরে চর্বি জমে, এক্সট্রা চর্বি। ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের যে উন্নয়নের কথা সরকার বলছে, একটা শ্রেণি বা গোষ্ঠীর উন্নয়ন হচ্ছে। এই উন্নয়ন সাধারণ মানুষের নয়, এই উন্নয়ন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উন্নয়ন। এর ফলে আজকে দেশ এমন একটা পরিস্থিতিতে পড়েছে, যেখানে মানুষ দুই বেলা খাওয়ার জন্য তার যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সংস্থান করা প্রয়োজন সেটাও করতে পারছে না। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ সরকারের পতন বলে উল্লেখ করেন নোমান।

বিজ্ঞান ও কারিগরি পরামর্শদাতা মিফতাহুর রহমান বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও স্বপ্ন ছিল একটি আধুনিক রাষ্ট্রের। দেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে আজও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সাধারণ মানুষ তাদের অপরিসীম ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর অনেক কিছুই নীরবে সহ্য করে যাচ্ছে। দেশের নেতাদের কাছে তাদের প্রত্যাশা, তারা এ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আশা-আকাক্সক্ষাকে গুরুত্ব দেবেন। কিন্তু সেটি এখন দেখা যাচ্ছে না।